আশুলিয়ায় বিস্ফোরণ: মেয়াদ ফুরনো সিলিন্ডারে অবৈধভাবে ভরা হয় গ্যাস
- মৃত্যু বেড়ে ৮

সংগৃহীত ছবি
ঢাকার আশুলিয়ায় পোশাক কারখানা চত্বরে বিস্ফোরিত গ্যাস সিলিন্ডারগুলোর মধ্যে অন্তত একটির মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল ২০২১ সালেই। সেটিতে আবার ফিলিং স্টেশন থেকে অবৈধভাবে ভরা হয়েছিল গ্যাস। ঘটনাস্থলে পাওয়া বিস্ফোরিত একটি সিলিন্ডারের গায়ে ‘ডু নট ইউজ আফটার ২০২১’ (২০২১ সালের পর ব্যবহার নিষিদ্ধ) লেখা ছিল। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অতিরিক্ত লাভের আশায় কিছু তেলপাম্প বা ফিলিং স্টেশন থেকে গোপনে এসব মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারে গ্যাস সরবরাহ করা হতো, যা কারখানার জেনারেটর বা অন্যান্য কাজে অবৈধভাবে ব্যবহার করা হতো। ভয়াবহ এই বিস্ফোরণে গতকাল সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত অন্তত আটজন নিহত এবং ২০ জন আহত হওয়ার তথ্য মিলেছে। ঘটনাটি তদন্তে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে গঠন করা হয়েছে চার সদস্যের একটি কমিটি।
আশুলিয়ার জামগড়া চৌরাস্তা এলাকায় প্রিটি গ্রুপের কারখানা চত্বরে গত রবিবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে ওই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, কারখানার নির্ধারিত পার্কিং এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডারবাহী লরি ও কাভার্ড ভ্যানে আগুন লাগার পর একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় কয়েকটি সিলিন্ডার ও ধাতব অংশ আশপাশের ভবন, দোকান ও রাস্তায় ছিটকে পড়ে। আজ মঙ্গলবার ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা যায়, বিস্ফোরণের স্থান থেকে বেশ দূরের একটি হোটেলের সামনে পড়ে আছে একটি সিলিন্ডার। হোটেলে পড়ে থাকা সিলিন্ডারটির গায়ে লেখা রয়েছে, ‘ডোন্ট ইউজ আফটার ২০২১’। অর্থাৎ ২০২১ সালের পর সেটি ব্যবহারের কথা নয়।
বিস্ফোরণে প্রায় ৩০০ গজ দূরের একটি ভবনের দেয়াল ভেদ করে লোহার অংশ ঢুকে যায়। এতে দেয়ালে ফাটল ও বড় ছিদ্র তৈরি হয়েছে। আশপাশের আরও কয়েকটি ভবন ও দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে আগুনের সংস্পর্শ অথবা মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার থেকে বিস্ফোরণের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। আর বিস্ফোরক পরিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, কাভার্ড ভ্যান বা লরিতে গ্যাস সিলিন্ডার মজুদের প্রক্রিয়াটি ছিল পুরোপুরি অবৈধ। দেশের কোনো আইন বা বিধানেই এটি অনুমোদিত নয়।
এই বিস্ফোরণের ঘটনায় নিহতদের মধ্যে দগ্ধ পাঁচজনের পরিচয় এখনো পায়নি পুলিশ।
রবিবার রাতে আগুন নেভানোর কাজে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন জিরাবো ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার সাহাবুদ্দিন। তিনি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জানালেন, কারখানাটিতে ৭-৮টি লরির ভেতরে গ্যাস সিলিন্ডার ভর্তি করা ছিল। কারখানাতে তিতাসের গ্যাসের সংযোগ থাকলেও লাইনে পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় বিকল্প হিসেবে সিলিন্ডার লরি থেকে গ্যাস ব্যবহার করা হতো। তবে এসব লরিতে ব্যবহৃত সিলিন্ডারগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সিলিন্ডারের ভেতরে থাকা অতিরিক্ত চাপ বা প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে ৪ নম্বর লরিতে হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটে বলে তার ধারণা। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, কাভার্ড ভ্যানের ওপরের অংশ ও সিলিন্ডারের খণ্ডাংশ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। একটি অংশ ছিটকে পাশের বহুতল ভবনের ছাদে গিয়ে পড়ে। সিলিন্ডারগুলো থেকে প্রচুর গ্যাস বের হয়ে আগুনের তীব্রতা বাড়ছিল।
কাভার্ড ভ্যানের ভেতরে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহারের বিষয়ে সাহাবুদ্দিনের ভাষ্য, সিএনজির বিকল্প হিসেবে এভাবে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহারের কোনো বিধান আছে বলে তার জানা নেই। বিষয়টি তারা তদন্ত করবেন। কাভার্ড ভ্যানের ভেতরে এভাবে সিলিন্ডার রেখে ব্যবহার কিছুটা আড়ালে করা হয়।
এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিসন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এস এম মাহবুব আলম বললেন, ‘মূলত গ্যাস সরবরাহ করা হয়ে থাকে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য। কোনো অবস্থাতেই লরিতে সিলিন্ডার ভর্তি করে কারখানায় ব্যবহার করা আইনগত পরিপন্থী কাজ।’
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের উপপ্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক মো. তোফাজ্জল হোসেন জানালেন, পেট্রলপাম্পের লাইন্সেস দেওয়ার শর্ত ভঙ্গ করে ওই দুর্ঘটনাকবলিত লরিগুলোতে গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছিল।
এ বিষয়ে সাভারের ইউএনও সাইফুল ইসলাম বললেন, ‘বিভিন্ন পেট্রলপাম্পে অভিযানের জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিষয়টি বিস্ফোরক অধিদপ্তরকে অবহিত করা হয়েছে।’



