মীরের বাড়ি: এক গ্রাম থেকেই আসে উপজেলার অর্ধেক সবজি

সবজি ক্ষেতে কাজ করছেন তিনজন কৃষক। ছবি: আগামীর সময়
ভোরের আলো ফুটতেই কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের মীরের বাড়ির মাঠে শুরু হয় কৃষকের ব্যস্ততা। কেউ ব্যস্ত জমিতে সবজির পরিচর্যা করতে, কেউ আগাছা পরিষ্কারে, আবার কেউ ব্যস্ত ফসল সংগ্রহে। এক জমিতে বেগুন, অন্য জমিতে করলা, লাউ কিংবা শিম। কোথাও আবার শীতকালীন বাঁধাকপি ও ফুলকপির চারা।
বছরের প্রায় প্রতিটি মৌসুমেই সবুজে ভরে থাকে এ গ্রামের মাঠ-ঘাট। তাই স্থানীয়দের কাছে মীরের বাড়ি পরিচিত হয়ে উঠেছে ‘সবজির রাজ্য’ হিসেবে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে মীরের বাড়ির ৪০০ হেক্টর জমিতে সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। আর উপজেলায় চাষের লক্ষ্যমাত্র ছিল ৭৬০ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ উপজেলার মোট লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৫৩ শতাংশ সবজি চাষ মীরের বাড়ির জমিতে হয়েছে।
মীরের বাড়ির অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। সংখ্যায় যা প্রায় ৮০০। তবে গতানুগতিক ধান চাষের পরিবর্তে সবজি চাষকেই প্রধান কৃষিকাজ হিসেবে বেছে নিয়েছেন তারা। সারা বছর বিভিন্ন মৌসুমি সবজি উৎপাদন করে স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এসব সবজি যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
সরেজমিন মীরের বাড়ি গ্রামের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মাঠের পর মাঠ জুড়ে শাক-সবজির সমারোহ। কৃষকের শ্রম, পরিচর্যা ও মাটির গুণে বেড়ে উঠছে এসব ফসল। বাড়ির আঙিনা থেকে বিস্তীর্ণ আবাদি জমি, সবখানেই যেন সবুজের ছোঁয়া।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনাতেই কমবেশি সবজির গাছ রয়েছে। অধিকাংশ আবাদি জমিতেই চাষ হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের সবজি। মীরের বাড়ির মাটি মূলত দোআঁশ। বালি, পলি ও কাদামাটির সমন্বয়ে গঠিত এ মাটি সবজি চাষের জন্য উপযোগী। পাশাপাশি জমিগুলো তুলনামূলক উঁচু হওয়ায় অতিরিক্ত পানি জমে থাকে না। বাজারে সবজির চাহিদা ও তুলনামূলক ভালো লাভের আশায় কৃষকরাও সবজি চাষে বেশি ঝুঁকছেন।
মাটির গুণ ভালো হওয়ায় অনেক সময় কম সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেই ভালো ফলন পাওয়া যায়। এতে উৎপাদন খরচ কমে এবং সবজির গুণগত মানও ভালো থাকে বলেও জানালেন কৃষকরা।
স্থানীয় কৃষক মো. জাহেরুল ইসলাম বলেছেন, ‘মুই সারা বছর মোর জমিত আনাইজ (সবজি) চাষ করোং। অন্যকিছু চাষ করোং না। হামার এই মাটিত যাদু আছে। অল্প সার দিয়া ভালো আবাদ হয়। লাভ হয় ভালো। লাভ ছাড়ি লসোত যাইম ক্যা?’
সবজি চাষে লাভের হিসাবও দিয়েছেন জাহেরুল। এ বছর শীত মৌসুমের জন্য ৫০ শতক জমিতে বাঁধাকপি ও ৬০ শতক জমিতে ফুলকপি চাষ করেছেন তিনি। এতে খরচ হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার টাকা। ফসল ভালো হলে এবং বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম পেলে প্রায় ২ লাখ টাকার সবজি বিক্রির আশা করছেন তিনি।
এ ছাড়া ৪০ শতক জমিতে হলুদ চাষ করেছেন এই কৃষক। এতে তার খরচ হয়েছে ২০ হাজার টাকা। ওই জমি থেকে ১০০ মণ হলুদ পাওয়ার আশা করছেন তিনি। বর্তমান বাজারদর মণপ্রতি ১ হাজার টাকা ধরে প্রায় ১ লাখ টাকার হলুদ বিক্রি হবে বলে আশা করছেন। সব খরচ বাদ দিয়ে এতে প্রায় ৫০ হাজার টাকা লাভ হতে পারে বলে তার ধারণা।
কৃষাণী জহুরা বেগম ও রহিমা বেগম জানিয়েছেন, তারা অন্যের ৩০ শতক জমি বর্গা নিয়ে সবজি চাষ করেছেন। এবার ওই জমিতে বেগুন চাষ করেছেন তারা। জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, বালাইনাশক, সেচ ও পরিচর্যাসহ সব মিলিয়ে তাদের খরচ হয়েছে ২৭ হাজার টাকা। জমিতে শ্রমিক হিসেবেও নিজেরাই কাজ করছেন।
তারা আশা করছেন, ফলন ভালো হলে ৫৫ থেকে ৬০ মণ বেগুন পাওয়া যাবে। বর্তমান বাজারদর প্রতি কেজি ৩০ টাকা হিসাবে ৫৫ মণ বেগুনের মূল্য প্রায় ৬৬ হাজার টাকা এবং ৬০ মণের মূল্য প্রায় ৭২ হাজার টাকা হতে পারে।
আরেক কৃষক রুহুল আমিন ৪৫ শতক জমিতে করলা চাষ করেছিলেন। এরই মধ্যে তিনি ওই করলা বিক্রিও করেছেন। ৪৫ শতক জমিতে করলা চাষ করে তিনি ২৮ হাজার টাকা লাভ করেছেন। এখন শীত মৌসুমে ওই জমিতে বাঁধাকপি চাষ করবেন।
মীরের বাড়ি থেকে সবজি সংগ্রহকারী স্থানীয় পাইকার দুলু মিয়া বলেছেন, ‘৩০ টাকার আনাইজ কিনি, ৫০ টাকায় বাইরা পাঠাই। সেই আনাইজ বাইরা দোকানদার ৮০ টাকা বেচায়।’
সবজি বিক্রির সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় ব্যবসায়ী রায়হান বাদশাহর ভাষ্য, ‘কৃষকের আনাইজ পাইকার নিয়ে যায় কম দামে। বাজারোত দাম চড়া পাইকারের জন্যে।’
তবে সবজি চাষে সম্ভাবনার পাশাপাশি সার ও কীটনাশকের দাম নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, অনেক সময় দোকানে গিয়ে চাহিদামতো সার পাওয়া যায় না। সার কিনতে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার না পাওয়ায় সময়মতো জমিতে প্রয়োগ করা নিয়ে তাদের উদ্বেগ থাকে।
কৃষক মাইদুল ইসলাম জানিয়েছেন, আগের মতো সার পাচ্ছেন না। দোকানে সার কিনতে গেলে বিভিন্ন অজুহাতের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। লাউ, শিম, ধুন্দল ও বেগুনসহ বিভিন্ন সবজিতে রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে বালাইনাশক প্রয়োজন হয়। কিন্তু এর দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বাড়ছে। বর্তমান বাজারদর ধরে সবজি বিক্রি করতে পারলে লাভ থাকলেও উৎপাদন খরচ আরও বাড়লে লোকসানের আশঙ্কা করছেন।
রাজারহাট উপজেলার অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা হৈমন্তী রানী আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, বর্তমানে উপজেলায় কোনো সারসংকট নেই। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে সার সরবরাহ করা হচ্ছে।








