তিন প্রবাসীর হাত ধরে বদলে যাচ্ছে অসম্ভবের গল্প
ব্রিটেনের মাটিতে বাংলাদেশি সবজির স্বপ্ন

ছবি: আগামীর সময়
ব্রিটেনের ঠান্ডা, অনিশ্চিত ও বৈরী আবহাওয়ায় লাউ, পুঁইশাক, লালশাক কিংবা ঢ্যাঁড়শের মতো বাংলাদেশি শাকসবজি বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা—কয়েক বছর আগেও বিষয়টি অনেকের কাছে প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হতো। কিন্তু সেই ধারণাকেই বদলে দিয়েছেন তিন প্রবাসী বাংলাদেশি তরুণ উদ্যোক্তা। টানা ৪ বছর ধরে ব্রিটেনে বাংলাদেশী সব্জি বানিজ্যিক ভাবে চাষ করে নতুন এক দিগন্তের সূচনা করেছেন তাঁরা।
কুমিল্লার হাবিবুর রহমান ও আবদুর রাজ্জাক এবং নওগাঁর ইমদাদ উল্লাহ—তিন বন্ধুর শ্রম, অভিজ্ঞতা ও স্বপ্নের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে ‘ফ্রেশ কৃষি’। লন্ডনের উপকণ্ঠের ইপিং এলাকায় প্রায় তিন হেক্টর জমির বিশাল গ্রিনহাউসে এখন সারি সারি বেড়ে উঠছে বাংলাদেশের পরিচিত লাউ, লালশাক, পুঁইশাক, ডাঁটা, কলমি শাক, বেগুন, ঢ্যাঁড়শ ও শিম।
কুয়াশা আর শীতের দেশের বুকে এই সবুজ ফসল যেন এক টুকরো বাংলাদেশ।
প্রতিদিন দুই হাজার কেজি সবজি
আধুনিক গ্রিনহাউস প্রযুক্তির সহায়তায় শুধু গ্রীষ্মের কয়েক মাস নয়, বছরের প্রায় সাত থেকে আট মাস পর্যন্ত বাংলাদেশি শাকসবজি উৎপাদন করছেন উদ্যোক্তারা।
ফ্রেশ কৃষির অন্যতম উদ্যোক্তা আবদুর রাজ্জাক জানান, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই হাজার কেজি সবজি তাঁদের খামার থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। সকালবেলা গ্রিনহাউস থেকে তোলা সবজি অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে যাচ্ছে পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি অধ্যুষিত হোয়াইটচ্যাপেল, গ্রিন স্ট্রিটসহ বিভিন্ন এলাকার দোকান ও বাজারে।
এ বছর তাদের লক্ষ্য প্রায় ৪ লাখ পাউন্ড মূল্যের সবজি বিক্রি করা। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৭ কোটি টাকা।
উদ্যোক্তাদের মতে, ব্রিটেনে বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় শাকসবজির বাজার ইতোমধ্যেই বিশাল। শুধু বাংলাদেশি সবজির বাজারমূল্যই কয়েক শ কোটি টাকার। কিন্তু এর বড় অংশ এখনো আমদানিনির্ভর। তাদের স্বপ্ন—এই বাজারের বড় একটি অংশ ভবিষ্যতে ব্রিটেনের মাটিতেই উৎপাদন করা।
ইতালির মাঠ থেকে ব্রিটেনের গ্রিনহাউস
ফ্রেশ কৃষির পেছনের গল্প অবশ্য একদিনে তৈরি হয়নি।
এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হাবিবুর রহমানের কৃষির সঙ্গে সম্পর্ক শুরু হয় বহু বছর আগে, ইতালিতে।
জীবনের পরিবর্তনের আশায় কিশোর বয়সে ২০০৩ সালে তিনি ইতালি যান। প্রবাসজীবনের শুরুতে নানা কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর একসময় কৃষিকাজে প্রবেশ করেন। ধীরে ধীরে ইউরোপের আবহাওয়া, সবজি উৎপাদন, বাজারজাতকরণ এবং বিভিন্ন দেশে পণ্য সরবরাহের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
একসময় ইতালি থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সবজি সরবরাহ করতেন তিনি।
পরবর্তীতে ব্রেক্সিটের সময় ব্রিটেনে চলে আসেন। আর এখান থেকেই শুরু হয় নতুন এক স্বপ্ন—ব্রিটেনের মাটিতে বাংলাদেশি সবজি উৎপাদনের। কিন্তু স্বপ্নের পথ মোটেও সহজ ছিল না।
হাবিবুর রহমান বলেন, ব্রিটেনে এসে প্রথম সমস্যা ছিল উপযুক্ত জমি ও গ্রিনহাউস খুঁজে পাওয়া। এরপর ছিল অনুমতি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন আবহাওয়ায় ফসল উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ। শুরুটা হয়েছিল একটি ছোট ও প্রায় ভাঙাচোরা গ্রিনহাউসে।
প্রথম বছরেই বড় ধাক্কা
প্রথম প্রচেষ্টায় সাফল্য আসেনি। বরং পুরো প্রকল্পই প্রায় ব্যর্থ হয়ে যায়। হাবিবুর রহমান বলেন,
“ব্রিটেনের আবহাওয়া সম্পর্কে তখন আমাদের পর্যাপ্ত ধারণা ছিল না। এখানকার গ্রিনহাউস কীভাবে পরিচালনা করতে হয়, তাপমাত্রা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়—এসবও ভালোভাবে জানা ছিল না। ফলে প্রথম বছরেই বড় ধরনের লোকসান হয়।”
অনেকেই হয়তো সেই ব্যর্থতার পর থেমে যেতেন। কিন্তু তিন বন্ধু তা করেননি। ব্যর্থতাকে তারা অভিজ্ঞতা হিসেবে নিয়েছেন। কোথায় ভুল হয়েছিল, কোন ফসল কোন তাপমাত্রায় ভালো হয়, কখন বীজ বপন করতে হবে, আলো ও তাপমাত্রার ভারসাম্য কীভাবে রাখতে হবে—সবকিছু নতুন করে শেখা শুরু করেন।
অবশেষে ২০২৪ সালে হারলো এলাকায় প্রায় তিন হেক্টরের একটি বড় গ্রিনহাউসের সন্ধান পান তারা।
পুঁজি ছিল সীমিত। আধুনিক কৃষিযন্ত্র কেনার সামর্থ্যও তখন ছিল না। তাই হাতে চালানো একটি ছোট ট্রাক্টর দিয়েই শুরু হয় মাটি প্রস্তুত করা। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত—নিজেদের শ্রমেই তৈরি করেন উৎপাদনের ক্ষেত্র। সেই শ্রমের ফলও আসে দ্রুত।
প্রথম সফল মৌসুমেই প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার পাউন্ড মূল্যের সবজি বিক্রি করেন তারা।
সকালে ক্ষেত থেকে, বিকেলেই দোকানে
ফ্রেশ কৃষির অন্যতম বড় শক্তি হলো সতেজতা। ব্রিটেনের বাজারে পাওয়া বাংলাদেশি বা দক্ষিণ এশীয় অনেক সবজি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। বিশেষ করে ইতালি থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সবজি আসে।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দোকানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনেক সবজি সতেজতা হারায়। কখনো কখনো পরিবহনের সময় নষ্টও হয়ে যায়।
ফ্রেশ কৃষির উদ্যোক্তা ইমদাদ উল্লাহ বলেন,
“আমরা চাই এখানে বসবাসরত বাংলাদেশিরা যেন নিজের দেশের মতো একেবারে টাটকা লালশাক, পুঁইশাক বা কলমি শাক খেতে পারেন। সকালে মাঠ থেকে তোলা সবজি যেন একই দিন দোকানে পৌঁছায়—এটাই আমাদের লক্ষ্য।”
তাদের খামারে উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে আনা বিভিন্ন জাতের বীজ। পাশাপাশি মাটির উর্বরতা ও ফসলের গুণগত মান ধরে রাখতে জৈব সার ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
উদ্যোক্তাদের দাবি, পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত উৎপাদন পদ্ধতিই তাঁদের সবজিকে বাজারের অন্য পণ্য থেকে আলাদা পরিচিতি দিচ্ছে।
শুধু ব্যবসা নয়, শিকড়ের টানও
ফ্রেশ কৃষির গ্রিনহাউসের ভেতরে হাঁটলে এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি হয়। ব্রিটেনের মাটিতে দাঁড়িয়ে চারপাশে পুঁইশাক, লালশাক, শিম কিংবা লাউয়ের সারি যেন মুহূর্তের জন্য কাউকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে বাংলাদেশের গ্রামে।
এই কৃষি উদ্যোগ তাই শুধু লাভ-লোকসানের হিসাব নয়। প্রবাসে বসবাসরত লাখো বাংলাদেশির খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিজ দেশের স্বাদ, স্মৃতি এবং সংস্কৃতি। বাংলাদেশের বাজার থেকে সদ্য কেনা লালশাক কিংবা বাড়ির উঠোনের লাউয়ের যে স্বাদ—সেটি ব্রিটেনের মাটিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টাও করছেন এই তিন উদ্যোক্তা।
তাদের কাছে কৃষি তাই একই সঙ্গে ব্যবসা, আত্মপরিচয় এবং শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ।
আরও উদ্যোক্তা চান তারা
নিজেদের সফলতার গল্প নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চান না হাবিবুর রহমান, আবদুর রাজ্জাক ও ইমদাদ উল্লাহ।
তাদের বিশ্বাস, ব্রিটেনে বাংলাদেশি সবজির যে বাজার রয়েছে, সেখানে একজন বা দুজন উদ্যোক্তার পক্ষে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। আরও মানুষ যদি পরিকল্পিতভাবে কৃষিতে আসেন, তাহলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সবজির পরিমাণ বাড়বে, আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হতে পারে।
আবদুর রাজ্জাক বলেন, “আমরা সফল হয়েছি বলে এখানেই থেমে থাকতে চাই না। নতুন কেউ যদি বাণিজ্যিকভাবে বাংলাদেশি সবজি চাষ করতে চান, আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে যতটা সম্ভব সহযোগিতা করতে চাই।”
তাদের স্বপ্ন ভবিষ্যতে উৎপাদনের পরিসর আরও বাড়ানো, নতুন জাতের বাংলাদেশি সবজি চাষ করা এবং ব্রিটেনের আরও বেশি শহরে সরাসরি টাটকা পণ্য পৌঁছে দেওয়া।
ফ্রেশ কৃষির তিন উদ্যোক্তার গল্প তাই শুধু তিন প্রবাসী বাংলাদেশির ব্যবসায়িক সাফল্যের গল্প নয়; এটি ব্যর্থতাকে জয় করার, বিদেশের মাটিতে নতুন সম্ভাবনার দরজা খোলার এবং দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে থেকেও নিজের মাটি ও স্বাদের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার গল্প।










