সলিমগঞ্জ উপ স্বাস্থ্যকেন্দ্র
জলাবদ্ধতা, বিষধর সাপ ও মশার উপদ্রবে আতঙ্কে চিকিৎসক-রোগী

ছবি: আগামীর সময়
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সলিমগঞ্জ উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রটি বর্তমানে জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে রোগীদের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির সামনে বৃষ্টির পানি জমে থাকায় প্রতিদিন চিকিৎসাসেবা নিতে আসা ২০০-৩০০ মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে ও চারপাশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায় এবং পানি নিষ্কাশনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় মাসের পর মাস সেই পানি জমে থাকে। কেন্দ্রটি এখন যেন পরিণত হয়েছে বিষধর সাপ, বিষাক্ত পোকামাকড়, ডেঙ্গু মশা-ব্যাঙের অভয়ারণ্য। তবে এখানকার ডাক্তার, নার্স জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করে আসছেন।
সরেজমিন দেখা যায়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মূল প্রবেশপথ ও আশপাশের এলাকা জুড়ে পানি জমে রয়েছে। ফলে রোগীদের কাদাযুক্ত ময়লা পানির মধ্য দিয়ে বিষধর সাপ, বিষাক্ত পোকামাকড়, ডেঙ্গু মশা–ভয় নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রবেশ করতে হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু, নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে উঠেছে। অনেকেই পানিবন্দি পরিবেশ দেখে বিষধর সাপ ও ডেঙ্গু মশার ভয়ে চিকিৎসা না নিয়েই ফিরে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সলিমগঞ্জ উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটি এলাকার হাজারো মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসা। অথচ এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানের সামনের পরিবেশ এতটাই নাজুক যে সামান্য বৃষ্টিতেই রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি শুধু সলিমগঞ্জ এলাকার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, পার্শ্ববর্তী বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ও নরসিংদী রায়পুরা উপজেলার ১০-১৫টি গ্রামের মানুষ চিকিৎসাসেবা নিয়ে থাকেন। এখানে নিয়মিত টিকা কার্যক্রম, প্রসূতি সেবা, অপারেশন, ওষুধ বিতরণসহ নানা চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়; কিন্তু অবকাঠামোগত দুরবস্থা, ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাব এবং নিয়মিত পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার ঘাটতির কারণে কেন্দ্রটির কার্যক্রম এখন অনেকটাই স্থবির। বর্তমানে ভবনের ভেতরে ও বাইরে জমে থাকা পানি পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। আর পরিত্যক্ত ভবনগুলো নির্মিত গণশৌচাগার পরিণত হয়েছে, ভবনগুলোর ভেতরে বাইরে ময়লা-আবর্জনা পানি জমে বিষধর সাপ, ডেঙ্গু মশার উপদ্রব বেড়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা কয়েকজন রোগী জানিয়েছেন, অসুস্থ অবস্থায় কাদা ও পানি মাড়িয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছানো অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। অনেক সময় পা পিছলে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকে। বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও বয়স্কদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ।
স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চারপাশে জমে থাকা পানিতে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা, সাপের উপদ্রব বেড়েছে। আশপাশের এলাকায় এর মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে; কিন্তু এখন পর্যন্ত পানি নিষ্কাশনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
জামাল হোসেন নামে একজন রোগী অভিযোগ করে বলেছেন, দীর্ঘদিন এই সমস্যা চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই। বর্ষা মৌসুম এলেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়; কিন্তু বছরের পর বছর পার হলেও এর স্থায়ী সমাধান করা হয়নি। পানি নিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্ত ড্রেনেজব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টির পানি আটকে থেকে রোগীদের ভোগান্তি বাড়িয়ে তুলেছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের একটি প্রতিষ্ঠানের সামনে জলাবদ্ধতা, বাজারে পোলট্রি মুরগির রক্ত ও নাড়ি-ভুঁড়ি, পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল থেকে শুরু করে সকল প্রকার ময়লা-আবর্জনা, পরিচ্ছন্নকর্মীরা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভেতরে ফেলেছে, জমে থাকা পানির সঙ্গে মিশে পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এটি শুধু অব্যবস্থাপনারই পরিচয় নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকিস্বরূপ। জমে থাকা পানিতে মশার বিস্তার বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন রোগ-জীবাণুর সংক্রমণের আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, একটি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে দীর্ঘদিন ধরে পানি জমে থাকলেও বিষয়টি কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চোখে পড়ে না? প্রতিদিন রোগীরা ভোগান্তির শিকার হলেও কেন সমস্যাটি সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না— এমন প্রশ্ন এখন সর্বত্র।
এদিকে এলাকাবাসী দাবি দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গ্রহণ, প্রয়োজনীয় ড্রেন নির্মাণ, প্রবেশপথ সংস্কার এবং স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।
তাদের মতে, সরকারি অধ্যায়ন ছাড়া দীর্ঘদিনের এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, বর্ষা মৌসুমে যখন জনগণের স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে যায়, তখন একটি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনেই যদি জলাবদ্ধতার কারণে রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। স্থানীয়দের একটাই প্রশ্ন— সলিমগঞ্জ ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের এই দুরবস্থা কি সত্যিই কারও নজরে আসে না? নাকি দেখেও দেখার কেউ নেই
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পুনর্নির্মাণের জন্য প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। একটু সময় নেবে। আশা করি পুনর্নির্মাণ হয়ে গেলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আর ১-২ দিনের মধ্যে স্থানটি পরিদর্শন করে পানি নিষ্কাশনের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে একটি অর্থ বরাদ্দ নেওয়ার চেষ্টা করব।






