সোনালুর হলুদ মায়ায় থমকে দাঁড়ায় পথিক

ছবি: আগামীর সময়
প্রকৃতির সবুজ ক্যানভাসে যেন কেউ ছড়িয়ে দিয়েছে হলুদের চাদর। গাছের ডালে ডালে ঝুলে থাকা থোকা থোকা সোনালু ফুলে বদলে গেছে চারপাশের চেনা দৃশ্য। দীর্ঘ মঞ্জুরিতে ফুটে থাকা উজ্জ্বল হলুদ ফুলগুলো দূর থেকেই পথচারীদের দৃষ্টি কাড়ছে। প্রখর রোদ আর গরমের ক্লান্তি ভুলে অনেকেই দাঁড়িয়ে পড়ছেন গাছের নিচে। কেউ মুঠোফোনে ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, আবার কেউ উপভোগ করছেন প্রকৃতির এই ক্ষণিকের সৌন্দর্য। হলুদ ফুলের এমন অপরূপ সাজে দিনাজপুরের বিভিন্ন সড়ক ও জনপদে তৈরি হয়েছে মনোরম পরিবেশ।
সোনালু ফুলের এই সৌন্দর্য শুধু চোখ জুড়ায় না, অনেকের মনে ফিরিয়ে আনে শৈশবের স্মৃতি। একসময় গ্রামবাংলার পথঘাট, বসতবাড়ির আঙিনা কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশে দেখা মিলত এই গাছের। সময়ের সঙ্গে অনেক গাছ হারিয়ে যাওয়ায় এখন কোথাও কোথাও সোনালু ফুলের দেখা মিললে মানুষ থমকে দাঁড়ান। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের কাছে ফুলের সৌন্দর্য হয়ে উঠেছে ছবি তোলা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার উপলক্ষ।
দিনাজপুর সামাজিক বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১৩টি উপজেলাসহ বিভিন্ন সড়ক, গ্রাম ও জনপদে সোনালু গাছ রয়েছে। বিরামপুর উপজেলাতেও রয়েছে প্রায় পাঁচ শতাধিক সোনালু ফুলের গাছ। জেলার রামসাগর এলাকায় যাওয়ার পথের দুই পাশ, কৃষি অফিসের সামনে ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এলাকায়ও দেখা যায় এই গাছ। ফুল ফোটার মৌসুমে হলুদ ফুলের সমারোহে এসব এলাকার পরিবেশ হয়ে ওঠে দৃষ্টিনন্দন। ফুলের হালকা মিষ্টি সুবাসে আকৃষ্ট হয় প্রজাপতি ও মৌমাছি।
দিনাজপুরের রামসাগর এলাকায় সোনালু ফুলের সৌন্দর্য দেখতে আসা তরুণী সাবরিন জাহান মিশু বলেন, ‘ফুলটি এখন খুব বেশি চোখে পড়ে না। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ সোনালু ফুলের গাছটি চোখে পড়ে। এত সুন্দর হলুদ ফুল দেখে ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল। ছোটবেলায় এই ফুল দিয়ে মালা তৈরি করে সাজতাম। এখন আগের মতো গাছ দেখা যায় না।’
বিরামপুর উপজেলার পলিপ্রয়াগপুর ইউনিয়নের বিরামপুর-ফুলবাড়ী সড়কের পাশে তুষার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে প্রায় ১০টি সোনালু গাছ। গাছগুলোতে থোকায় থোকায় ফুল ফুটে পুরো এলাকাকে হলুদ রঙে রাঙিয়ে তুলেছে। স্থানীয় পথচারী থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষ সেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। কেউ কেউ সেই ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রকাশ করছেন।
এদিকে হাকিমপুর উপজেলার স্টেশন এলাকাতেও রয়েছে সোনালু গাছ। স্টেশন চত্বর এলাকার বাসিন্দা পরিমল কুমার মণ্ডল বলেন, ‘সোনালু ফুল দেখলে মানুষের মনে প্রশান্তি আসে। কিন্তু কালের বিবর্তনে গাছগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। নতুন করে এই গাছ লাগানো প্রয়োজন। পাশাপাশি যেসব গাছ এখনো টিকে আছে, সেগুলোর যত্ন নেওয়া উচিত। তা না হলে নতুন প্রজন্মের কাছে সোনালু ফুল হয়তো শুধু গল্পের বিষয় হয়ে থাকবে।’
দিনাজপুর সামাজিক বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক নুরুন্নাহার বলেন, জেলায় সোনালু ফুলের গাছ খুব বেশি দেখা না গেলেও রামসাগর যাওয়ার সড়কের দুই পাশে, কৃষি অফিসের সামনে এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এলাকায় বেশ কিছু গাছ রয়েছে। গাছগুলো পরিবেশের জন্য উপকারী এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। দৃষ্টিনন্দন ফুলের কারণে এটি শোভাবর্ধনকারী গাছ হিসেবেও জনপ্রিয়। এ ছাড়া সোনালু গাছের কাঠ ব্যবহারযোগ্য এবং এর বাকল ও পাতায় ঔষধি উপাদান রয়েছে।
চরকাই রেঞ্জ কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, সোনালু ফুলের আরেক নাম অমলতাস। ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘গোল্ডেন শাওয়ার ট্রি’। ভারতীয় উপমহাদেশে বহু প্রাচীনকাল থেকেই এ গাছের উপস্থিতি রয়েছে। ঝাড়বাতির মতো ঝুলে থাকা দীর্ঘ মঞ্জুরিতে ফুটে ওঠা হলুদ ফুলই এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। ভারত, মিয়ানমার ও বাংলাদেশ এ গাছের আদি বিস্তৃতির অন্তর্ভুক্ত। এর ফুল, ফল ও পাতা বানরেরও প্রিয় খাদ্য। সোনালু কাঠের রং লালচে এবং এ কাঠ দিয়ে ঢেঁকি ও সাঁকো তৈরির প্রচলন রয়েছে।
বিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) কোমল কৃষ্ণ রায় বলেন, সোনালু গাছের ঔষধি গুণাগুণ রয়েছে। লোকজ চিকিৎসায় এর বাকল, পাতা ও ফলের শাঁস বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশেষ করে কোষ্ঠকাঠিন্যসহ কিছু শারীরিক সমস্যায় এর ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। তবে ঔষধি প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সোনালু গাছ। অথচ একসময় গ্রামবাংলার পরিচিত এই বৃক্ষ এখন অনেক জায়গায় কমে আসছে। ফুল ফোটার কয়েকটি দিন মানুষের চোখে আনন্দ ছড়ালেও ফুল ঝরে গেলে আবারও আড়ালে চলে যায় গাছটির সৌন্দর্য। তাই শুধু ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ নয়, সোনালু গাছ সংরক্ষণ ও নতুন করে রোপণের উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি। নইলে একদিন হলুদ ফুলের এই অপরূপ দৃশ্য নতুন প্রজন্মের কাছে বাস্তব নয়, হয়ে উঠতে পারে কেবল স্মৃতির গল্প।




