খতনা ক্যাম্পে অব্যবস্থাপনা, সেন্টমার্টিনের চেয়ারম্যানকে শোকজ

কক্সবাজারের টেকনাফের সেন্টমার্টিন দ্বীপে মেডিক্যাল ক্যাম্পে খতনা করানোর পর অর্ধশতাধিক শিশু ইনফেকশন ও রক্তক্ষরণে অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনায় ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলামকে শোকজ করেছে উপজেলা প্রশাসন। স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে আগে থেকে প্রয়োজনীয় সমন্বয় না করা ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগে বুধবার (৭ অক্টোবর) বিকেলে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
একই দিন অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসা দিতে টেকনাফ থেকে একটি মেডিক্যাল টিম সেন্টমার্টিনে পাঠানো হয়েছে। শাহপরীর দ্বীপ জেটিঘাট থেকে সকালে রওনা হয়ে দুপুর ১২টার দিকে দলটি দ্বীপে পৌঁছে। পরে স্থানীয় হাসপাতালে শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়া হয়। চিকিৎসকদের ভাষ্য, বর্তমানে অসুস্থ শিশুদের অবস্থা শঙ্কামুক্ত।
মেডিক্যাল টিমে ছিলেন শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. নওশাদ আলম কানন, ডা. আশরাফুল ইসলাম ও উপসহকারী শাওখাত হোসেন মিতু। এর আগে টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, খতনা কর্মসূচির বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগকে আগে থেকে জানানো হয়নি।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেছেন, স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় না করা ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগে ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে শোকজ করা হয়েছে। মেডিক্যাল টিমের প্রতিবেদন পাওয়ার পর খতনা কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বিনামূল্যের কর্মসূচির নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ অক্টোবর সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম তার নামে প্রায় ১২০ জনের একটি প্রতিনিধি দলের জন্য দ্বীপে ধর্মীয়, চিকিৎসা ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি নেন। ওই দলে ১২ জন চিকিৎসক ছিলেন। কর্মসূচির মধ্যে অসহায় শিশুদের বিনামূল্যে খতনা, ধর্মীয় মাহফিল ও বিভিন্ন মাদ্রাসায় দাওয়াতি কার্যক্রমও ছিল।
পরদিন ৪ অক্টোবর দলটি সেন্টমার্টিনে পৌঁছে অবকাশ রিসোর্টের একটি আবাসিক হোটেলে ‘আল মোমিন সমাজকল্যাণ ফাউন্ডেশন’ এর ব্যানারে বিনামূল্যে খতনা কর্মসূচি পরিচালনা করে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সী ২১০ শিশুর খতনা করা হয়।
কর্মসূচির দুই দিন পর থেকেই শিশুদের একাংশের ক্ষতস্থানে ব্যথা, ফুলে যাওয়া, পুঁজ, ইনফেকশন ও রক্তক্ষরণ দেখা দিতে শুরু করে। মঙ্গলবার সকাল থেকে সেন্টমার্টিন হাসপাতালেই চিকিৎসা নিতে আসে অন্তত ৫০ শিশু। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, তাদের অনেকের ক্ষতস্থানে ইনফেকশন ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ছিল। দুজনের অবস্থা একপর্যায়ে গুরুতর হওয়ায় টেকনাফে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
পরিবারগুলোর অভিযোগ, একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক শিশুর খতনা করানোর সময় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি ও চিকিৎসা-পরবর্তী যত্ন যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে খতনার পর শিশুদের অনেকে সমস্যায় পড়েছে। তবে শিশুদের অসুস্থতার সুনির্দিষ্ট কারণ মেডিক্যাল টিমের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
এরই মধ্যে বিনামূল্যে খতনা কর্মসূচিতে কয়েকজনের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, বিনামূল্যে খতনা করার কথা বলা হলেও কোনো কোনো শিশুর পরিবারের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। তবে কতজনের কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হয়েছে এবং কারা টাকা নিয়েছেন, সে বিষয়ে এখনো প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
ফয়েজুল ইসলাম অবশ্য খতনা করানোর সময় চিকিৎসকদের কোনো গাফিলতি ছিল বলে মানতে নারাজ। তিনি বলেছেন, শুরুতে ১২০ শিশুর খতনা করানোর পরিকল্পনা ছিল। পরে স্থানীয় লোকজনের চাপে আরও শিশু আসতে থাকায় সংখ্যা বেড়ে যায়।
তিনি বলছেন, “আমি একটি মেডিক্যাল টিম নিয়ে এসেছিলাম। তবে খতনা করানোর সময় তাদের কোনো গাফিলতি ছিল না। এটি সামান্য একটি বিষয়কে বড় করা হয়েছে। এখন শিশুরা চিকিৎসা পেয়ে সুস্থ আছে।”
ফয়েজুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় শিশুদের উপস্থিতি বাড়তে থাকায় বাধ্য হয়ে পরিকল্পনার বাইরে আরও শিশুদের খতনা করানো হয়। পরে অতিরিক্ত শিশুদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি তিনিও জানতে পারেন। তবে শোকজের চিঠি তখনও হাতে পাননি বলে জানান তিনি।
এদিকে মেডিক্যাল টিমের চিকিৎসক ডা. নওশাদ আলম কানন জানিয়েছেন, তারা প্রায় ১২০ শিশুকে পরীক্ষা করে কয়েকজনের মধ্যে ইনফেকশনের লক্ষণ পেয়েছেন এবং কয়েকজনের ড্রেসিং নতুন করে করতে হয়েছে। খতনার পর নিয়মিত ড্রেসিং ও প্রয়োজনীয় ওষুধ নিশ্চিত করা জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
চিকিৎসকদের মতে, সেন্টমার্টিনের মতো মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এলাকায় এ ধরনের কর্মসূচি আয়োজন করলে চিকিৎসা-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ। খতনার পর কোনো শিশুর রক্তক্ষরণ বা ইনফেকশন হলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এর আগে সেন্টমার্টিন হাসপাতালের উপসহকারী কর্মকর্তা ডা. শহীদুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, মঙ্গলবার প্রায় ৫০ শিশু চিকিৎসা নিতে আসে। তাদের কয়েকজনের ক্ষতস্থানে ইনফেকশন ও রক্তক্ষরণ ছিল।
তবে পরে টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকেরা জানান, ওই দুই শিশু টেকনাফ হাসপাতালে যায়নি। দ্বীপেই তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। বুধবার মেডিক্যাল টিম পাঠানোর পর শিশুদের অবস্থা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
খতনা কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেওয়া চিকিৎসকদের বক্তব্য জানতে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অনুমতির সময় দেওয়া মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা সাড়া দেননি। ফলে খতনা করার সময় কী ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল, শিশুদের জন্য কী ধরনের ওষুধ দেওয়া হয়েছিল এবং চিকিৎসা-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা কী ছিল এসব বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে উপজেলা প্রশাসন বলছে, পুরো ঘটনার কারণ জানতে মেডিক্যাল টিমের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের অসুস্থতার কারণ, খতনা করানোর সময় স্বাস্থ্যবিধি ও চিকিৎসা প্রটোকল যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না, চিকিৎসা-পরবর্তী ওষুধ ও ড্রেসিংয়ের ব্যবস্থা ছিল কি না এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। একই সঙ্গে বিনামূল্যের কর্মসূচির নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগেরও তদন্ত করা হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা তৈয়ব উল্লাহর মতে, সেন্টমার্টিনের মতো দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন দ্বীপে একসঙ্গে দুই শতাধিক শিশুর খতনা করানোর মতো বড় কর্মসূচির আগে স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে কতটা সমন্বয় করা হয়েছিল, সেটি এখন প্রশ্নের মুখে। কারণ, কর্মসূচির মাত্র দুই দিনের মধ্যে অর্ধশতাধিক শিশুকে ইনফেকশন ও রক্তক্ষরণের মতো সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছে।
এব্যাপারে ইউএনও এস এম অনীক চৌধুরীর দাবি, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই স্পষ্ট হবে, শিশুদের অসুস্থতার পেছনে চিকিৎসাগত কোনো ত্রুটি, স্বাস্থ্যবিধির ঘাটতি, চিকিৎসা পরবর্তী ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নাকি অন্য কোনো কারণ দায়ী ছিল। একই সঙ্গে বিনামূল্যের নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগেরও সত্যতা মিলবে তদন্তে।



