ছয় বছর পর খুলছে খুলনার দুই পাটকল

ফাইল ছবি
রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ হওয়ার ছয় বছর পর বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালু হচ্ছে খুলনার প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিল ও স্টার জুট মিল। এতে অন্তত ৬ হাজার ৩৯১ জনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ফলে দীর্ঘদিন শ্রমিকশূন্য থাকা খুলনার খালিশপুর শিল্পাঞ্চল আবারও শ্রমিক-কর্মচারীদের কোলাহলে মুখর হয়ে উঠবে।
লিজগ্রহীতারা ভাষ্য, প্রচলিত পাটজাত পণ্যের পাশাপাশি আধুনিক ও বহুমুখী পণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলে উন্নতমানের লিথিয়াম ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক যানবাহন উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে স্টার জুট মিলে ব্যাগ, জুতা, মশারি ও ছাতাসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৫৪ সালে খুলনা মহানগরের খালিশপুরে ভৈরব নদীর তীরে ৫০ একর জমির ওপর প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিল প্রতিষ্ঠা করা হয়। ভৈরব নদের অপর পাড়ে দিঘলিয়া উপজেলায় ৫৬ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠা করা হয় স্টার জুট মিল।
ক্রমাগত লোকসানের কারণে আওয়ামী লীগ সরকার ২০২০ সালের ২৫ জুন মিল দুটিসহ দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত আরও ২৫টি পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর ২ জুলাই পাটকল বন্ধ এবং গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের আওতায় শ্রমিকদের অবসায়নের প্রজ্ঞাপন প্রতিটি মিলের নোটিশ বোর্ডে টানিয়ে দেওয়া হয়। এতে মিল দুটির হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন।
বন্ধের সময় প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলে ৯৫৭টি তাঁত এবং স্টার জুট মিলে ৭৭০টি তাঁত ছিল। দীর্ঘ ছয় বছর বন্ধ থাকার কারণে অধিকাংশ তাঁত ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বর্তমানে প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলে ৩৮ জন কর্মকর্তা ও ৮২ জন কর্মচারীসহ ১২০ জন এবং স্টার জুট মিলে ১৯ জন কর্মকর্তা ও ৮১ জন কর্মচারীসহ ১০০ জন কর্মরত রয়েছেন।
বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) সূত্র জানায়, সর্বশেষ গত মঙ্গলবার সরকার প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিল হ্যামকো গ্রুপের কাছে এবং স্টার জুট মিল প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কাছে লিজ দিয়েছে।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলে প্রায় ২১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে হ্যামকো গ্রুপ। এতে কমপক্ষে ১ হাজার ১৫৩ জনের কর্মসংস্থান হবে। প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাব্য বার্ষিক টার্নওভার ধরা হয়েছে প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে স্টার জুট মিলে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। সেখানে ৫ হাজার ২৩৮ জনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাব্য বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।
লিজগ্রহীতা হ্যামকো কোম্পানি লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম, এইচআর অ্যান্ড অ্যাডমিন) মো. মাইনুদ্দীন সানা বলেন, ‘চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর বিজেএমসির কাছ থেকে তিন মাস সময় পাওয়া যাবে। সবকিছু ঠিকঠাক করতে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মিলটিতে সামান্য কিছু আধুনিক পাটজাত পণ্য উৎপাদন করা হবে। তবে উন্নতমানের লিথিয়াম ব্যাটারি ও ইলেকট্রিক ভেহিকেল উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হবে।’
অন্যদিকে স্টার জুট মিলের মহাব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ জানান, স্টার জুট মিলের ৫৬ একর জমির মধ্যে ৪৬ একর জমি ও অবকাঠামো ইজারা নেওয়া হয়েছে। আপাতত সেখানে ব্যাগ, জুতা, মশারি ও ছাতাসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা হবে। ভবিষ্যতে সেখানে একটি পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। মিলটি পুরোপুরি চালু হলে কমপক্ষে পাঁচ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে বলে জানান তিনি।
এ প্রসঙ্গে পাটকল রক্ষায় সম্মিলিত নাগরিক পরিষদ খুলনার আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বলছিলেন, ‘বাংলাদেশ প্রাইভেটাইজেশন বোর্ড ১৯৯৩ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ৭৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণ করেছে। তার অধিকাংশই চলেনি। বেশিরভাগ শিল্পপ্রতিষ্ঠানই তাদের লিজের টাকা সরকারকে পরিশোধ করেনি। বরং স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ী মহল এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান দেখিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া করে ছেড়েছে। এখনো যে তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না, তার নিশ্চয়তা আছে কি?’
তার ভাষ্য, সরকারের উচিত ছিল লোকসানের সঠিক কারণ নির্ণয় করে সরকারি উদ্যোগে আবার রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো চালু করা।




