‘কলেজের কিনারায়, কারখানার কোণায় কেবলই কবি’

টটোগ্রাম সাহিত্যিক ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরদার মোহাম্মদ নাজমুল কবির ইকবাল। ছবি: সংগৃহীত
‘কালিকচ্ছের কোণায় কানছায় কুটিরে কুটিরে, কলেজের কিনারায়, কারখানার কোণায় কেবলই কবি। কাড়ি-কাড়ি কবির কারখানা কিংবদন্তীর কালিকচ্ছে।’ এক সাধারণ কবির দেখা কঠিন বাস্তবতার অনন্য কিছু বর্ণনা মিলেছে ‘কেষ্ট কবি’ বইয়ে।
‘কেষ্টরে, কষ্টের কথা কেউরে কইসনা। কইয়া কাম কি? কইলে কেবল করুণাই করবে। কটাক্ষ করে কথা কইবে।’ গল্পের আরেক অংশে এভাবেই কষ্টের কথা ফুটিয়ে তুলেছেন কবি কেষ্ট।
বইজুড়ে এই কেষ্টর এমন সব বিবরণে কেবলই মিলবে ‘ক’ বর্ণের শব্দ। সাহিত্যের ভাষায় একে বলা হয় টটোগ্রাম। এই ধারায় তিনটি বই লিখেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের সরদার মোহাম্মদ নাজমুল কবির ইকবাল। সাহিত্যিক হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেন ‘ইসমোনাক’ নামে। অন্য বইদুটি হলো- ‘কেষ্ট কবির কষ্টগুলো’ এবং ‘কেষ্ট কবির কনফারেন্স’।
প্রকাশনা ও শিক্ষামূলক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম রাইটার্স ডাইজেস্ট ঘেঁটে জানা গেল- কী এই টটোগ্রাম সাহিত্য। বলা আছে গ্রিক শব্দ টটো আর গ্রামা মিলে এই সাহিত্যধারার নামকরণ। টটো অর্থ একই, গ্রামা অর্থ অক্ষর। অর্থাৎ টটোগ্রাম মানে এমন এক গল্প বা কবিতা, যার প্রতিটি কিংবা প্রধান শব্দের প্রথম অক্ষর হবে একই।
চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করতেই টটোগ্রাম ভঙ্গিতে রচিত সাহিত্যের কিছু উদাহরণ সামনে এলো। জানা গেল, ১৮৮৪ সালে একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ফরাসি সাহিত্যিক জর্জেস পেরেসের পরীক্ষামূলক লেখা- ‘অ্যান অ্যাকোমোডেটিং অ্যাডভারটিজমেন্ট এন্ড অ্যান অকওয়ার্ড অ্যাক্সিডেন্ট’। এই লেখার প্রতিটি শব্দ শুরু ইংরেজি অক্ষর ‘এ’ দিয়ে।
ইংরেজিতে টটোগ্রামে লেখা বেশ জনপ্রিয় দুটি লাইন হলো,
পিটার পাইপার পিকড অ্যা প্যাক অব পিকল্ড পিপারস
অ্যা প্যাক অব পিকল্ড পিপারস পিটার পাইপার পিকড
বাংলা সাহিত্যে টটোগ্রামের চর্চা তেমন প্রচলিত না। ইন্টারনেট ঘেঁটে সামনে এলো নিশাত সুবাহ মোহনা, কামাল উদ্দিন আহমেদ ও কেষ্ট কবির রচয়িতা ইসমোনাকের নাম। এর মধ্যে নিশাতের বেরিয়েছে ‘টইটম্বুর টটোগ্রাম’ নামের ছোটগল্পের বই। আর কামাল উদ্দিনের আছে ‘টেকসই টটোগ্রাম’, যেখানে উল্লেখ আছে এই সাহিত্যচর্চার ইতিহাস ও বিভিন্ন উদাহরণ।
তবে এই সাহিত্যচর্চায় বাংলাদেশে অন্যতম লেখক ইকবাল সরদার ওরফে ইসমোনাক। সরাইলের এই সাহিত্যিক তিনটি বই লিখেছেন, যার প্রতিটি শব্দ শুরু ‘ক’ বর্ণে।
প্রথম বইয়ের শব্দসংখ্যা ৭ হাজার, দ্বিতীয়টি ও তৃতীয়টিতে প্রায় ১০ হাজার। দেশের বিভিন্ন লাইব্রেরি ঘুরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিভিন্ন বই-অভিধান ঘেঁটে একযুগ ধরে তিনি সংগ্রহ করেছেন দুই লাখের বেশি ‘ক’ বর্ণের শব্দ। দিনের পর দিন খেটে ২০২১ সালে বের করেছেন একে একে তিনটি বই। বইমেলাতেও উঠেছিল ‘কেষ্ট কবি’ সিরিজটি।
সরাইল উপজেলার নোয়াগাঁও সরদার বাড়ির প্রয়াত হেফজু সরদারের ছেলে ইকবালের জন্ম ১৯৬৭ সালে। বিরল সাহিত্যচর্চার কারণে ২০২১ ও ২০২৪ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক তাকে দিয়েছেন স্বীকৃতি ও আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করার পর কিছুদিন শিক্ষকতায় ছিলেন। তবে সাহিত্যচর্চায় মন দিতে গিয়ে ছেড়েছিলেন পেশা। এখন অবশ্য স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেনে পড়াচ্ছেন তিনি।
তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘এই সাহিত্যচর্চা করতে গিয়ে কষ্ট সাধনার চেয়ে হয়ত তেমন কিছুই পাইনি। তবে সাধনা করে যা চেয়েছি, সেটিই সৃষ্টি করতে পেরেছি। এটাই বা কম কী। কিন্তু আমাদের সাহিত্য সমাজেরও কিছু দায় থেকে যায় আমার সৃষ্টিকে গ্রহণ করার, জানার এবং বাংলা ভাষাভাষী সকলকে জানানোর।’
কী ধরণের কষ্ট সহ্য করেছেন? জানতে চাইলে এই সাহিত্যিকের ভাষ্য, ‘জীবনের পঁচিশ বছর কেটেছে এই সাহিত্যকর্মের পেছনেই। জীবন-যৌবন, অর্থ-সম্পদ, ঘর-সংসার, স্ত্রী-সন্তান, চাকরি-উপার্জন সবই হারিয়েছি। আমার চাওয়া-পাওয়ার বা হারানোর আর কিছু বাকি নেই। দুঃখ নেই, অগণিত মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। আমি গর্বিত, আমি আমার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছি। বাংলা সাহিত্য তথা বাংলা ভাষাভাষী কোটি মানুষকে এক নতুন ধারার সাহিত্য উপহার দিতে পেরেছি।’
‘তবে আমার বিশেষ চাওয়া, এটি পৌঁছে যাক মানুষের হাতে। নতুন প্রজন্ম নতুন ধারার সাহিত্য রচনায় অনুপ্রাণিত হোক’- বলছিলেন ইকবাল ওরফে ইসমোনাক।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সাহিত্য একাডেমির সভাপতি কবি জয়দুল হোসেন বললেন, ‘ইসমোনাক ক বর্ণ দিয়ে ২৭ হাজার শব্দের তিনটি টটোগ্রাম সাহিত্য গ্রন্থ রচনা করে বিরল প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। এই মেধার কাজটি স্বীকৃতির দাবি রাখে। ইসমোনাক তার প্রতিভার স্বীকৃতি পেলে পরবর্তীতে অন্যরা অন্য বর্ণ দিয়ে টটোগ্রাম সাহিত্য রচনার অনুপ্রেরণা পাবে, আরও অনেকে নতুন ধারার সাহিত্য নিয়ে কাজ করবে।’
সবশেষে নিজের বই থেকে দুই লাইন শোনালেন ইসমোনাক।
“কৈলাশ কর কেন্দ্রীয় কমার্শিয়াল কলেজে কর্মকর্তার কাজ করে কুড়ি কাল কাটিয়েছেন কবি কালিপদ।কাজের কালে কাজী কবি কালিপদ কোন কালা-কানুনে কিছুতেই কম্প্রমাইজ করে না। কর্মকর্তা কবি কালিপদ কয়, ‘কাজের কালে কাজ, কেবলি কাজ’।”







