ভাস্কর চৌধুরী: নীরবে এক নক্ষত্রের পতন

‘সিগারেট থেকে সিগারেট
আগুন ছড়িয়ে যাচ্ছে
ক্লাস্টার বোমার মতো মাঠে
মজুরেরা বিড়ি থেকে বিড়ির আগুনে
জ্বালিয়ে নিচ্ছে নিজেদের আয়ু
একটি মাত্র কাঠি কোথায় কবে জ্বলেছিল
আজ কারো মনে নেই।’
[ক্লাস্টার, ভাস্কর চৌধুরী]
চেলে গেলেন কবি ও কথাসাহিত্যক ভাস্কর চৌধুরী। ২৮শে জুন আনুমানিক রাত ১০টার দিকে রাজধানীর একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন তিনি।
ভাস্কর চৌধুরী একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক। ১৯৫২ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভবানীপুরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। শিক্ষাজীবন কেটেছে রাজশাহী শহরে। বরেন্দ্র অঞ্চলের ‘লাল মাটি কালো মানুষ’ আর গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠার ফলে তার ভেতরের জীবনদর্শন ও সাহিত্যকর্মের মূলে স্থান পেয়ে বরেন্দ্র মাটি ও মানুষের শত বছরের উপকথাবহুল জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও আদিবাসী জীবনের সুখ-দুঃখ। আশির দশক থেকে তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। ‘রক্তপাতের ব্যাকরণ’ তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ। এ পর্যন্ত ত্রিশটিরও অধিক বই লিখেছেন।
কর্মজীবনে ছিলেন কাস্টমসের কর্মকর্তা। আশি ও নব্বই দশকে ঢাকায় লেখক-আড্ডার অন্যতম আশ্রয় ছিলেন তিনি। ছিলেন আড্ডাবাজ বন্ধু-অন্তপ্রাণ মানুষ। কিন্তু শেষ জীবনে এসে একা হয়ে পড়েন। বন্ধুকবিরা দূরে সরে যান। কিংবা তিনি নিজেই সবার থেকে সরে আসেন। তবে কবিতা থেকে সরে যাননি কখনো। প্রার্থনার মতো প্রতিদিন নিয়ম করে কবিতাচর্চা করে গেছেন, কয়েকশত কবিতা লিখেছেন। মোবাইলে বাটন টিপে লিখেছেন সাঁওতাল জাতিগোষ্ঠীর পরিচয় ও নৃতত্ত্ব নিয়ে এপিকধর্মী উপন্যাস ‘ধনসা মাতি ও তার জীবনবৃক্ষ’। তিনি নিজেও সাঁওতালদের সঙ্গে দীর্ঘ একটা সময় কাটিয়েছেন। সাঁওতালদের দৈনন্দিন জীবনপ্রবাহ, বিশ্বাস, রীতিনীতি, আচার-আচরণ সবই তিনি ভেতর থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। ফলে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ধনসা মাতির সঙ্গে লেখক নিজেও একাত্ম হয়ে মিশে গেছেন। সাঁওতাল জাতিগোষ্ঠীর জাতিসত্তা টিকিয়ে রাখার যে সংগ্রাম ধনসা আমৃত্যু করে যায় তার সঙ্গে লেখক নিজেও যেন জড়িয়ে গেছেন। উপন্যাসটি শুরু হয়েছে একটি মহাবয়ানের ভেতর দিয়ে: ‘ধনসা মাতি এক দুপুরে, যখন আদিগন্ত বরেন্দ্রে খরা, খাঁ খাঁ করছে চারদিক, বাউরি বাতাসে ধুলো আসমানমুখো—তখন সেই কালো গুমোট শূন্যতায় বায়ু ধুলোকে পাক দিয়ে উড়িয়ে জনপদের দিকে আসছিল, ল্যাংটা কিছু কালো বাদুর বাচ্চার মতো বাচ্চার মতো ছেলেমেয়ে দৌড়ে দৌড়ে বলছিল, ‘বাপো, বাঁড়ুল আলছে।’ ঠিক এসময় ধনসা মাতি গভীর ধ্যান থেকে চোখ মুঁদে বলেছিল, ‘এ বছর প্যাটে যা পাবি বাঁন্ধিস। ফসল হইবে না।’
প্রটাগনিস্ট ধনসা যৌবনে লেঠেল ছিল। ঢিবি কাটা দলের সর্দার হয়ে শত বরেন্দ্র অঞ্চলে শত ঢিবি কেটে চাষের জমি বানিয়েছে। বিয়ে করা বউ আর উপপত্নীর গর্ভে বাচ্চা পয়দা করে করে এলাকাটা সাঁওতালে ভরে তুলল। ধনসা মাতির নেতৃত্বে সাঁওতাল পল্লীর পত্তন ঘটল এই এলাকাতে। ধনসা তার সৃষ্ট মাঠঘাট-জনপদ দেখে অবাক হয়। সে ঠাওর করতে পারে না কার কোথায় কার ঘরে কত ছেলেমেয়ে তার। সে ঢিবি ঢিবি কাটতে কাটতে যে এলাকাতে গেছে সেখানেই নারীর গর্ভে সে চাষ করেছে মানবসন্তানের। ধনসা এখন কয়েক প্রজন্মের পিতৃপুরুষ। তাঁর বেঁচে থাকার কাল রহস্যময়। সে কয়েকশ বছর আগের ইতিহাসও যখন বর্ণনা করে তখন সে সেখানে উদ্দীপ্ত তরুণ।
ধনসা যখন রাজশাহীর মিশন হাসপাতালে মৃত্যুসজ্জায়, রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, নীলফামারী, ডোমার, পার্বতীপুর, এমনকি ভারতের মিদনাপুর থেকেও লোক এসেছে তাকে দেখতে। তারা জেনেছে তাদের পূর্বপুরুষদের কালের একজন বেঁচে আছে। তার কাছে নিজেদের অতীত সময়ের কথা জানতে এসেছে। বৃদ্ধ ধনসা স্মৃতি থেকে লেখক সাঁওতালদের জাতিসত্তা, তাদের নৃতত্ত্ব, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, বাংলাদেশ অংশে তাদের আগমন ও দীর্ঘ ৮৫ বছর পর এদেশ ত্যাগের অমানবিক কারণ এবং বিদ্রোহের কাহিনিসহ একটি জাতি গড়ে ওঠা ও বিনাশের ইতিহাস আমাদের সামনে উন্মোচন করেছেন।
উপন্যাসের শক্তিমত্তা প্রকাশ পেয়েছে এর আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। লেখক এখানে দু ধরনের গান ব্যবহার করেছেন। সাঁওতাল জাতি তাদের নানা অনুষ্ঠানে হাজার বছরের সাঁওতালি ভাষার গান ব্যবহার করে। লেখক বিবাহ, জন্ম, মৃত্যু, এসবে সাঁওতালি ভাষার গান ব্যবহার করেছেন। আর দৈনন্দিন জীবনে হাড়িয়া খেয়ে নাচের তালে তালে তারা যে গান করে সেগুলি স্থানীয় কথ্য বাংলা। কিন্তু সুর সাঁওতালী। উপন্যাসের প্রয়োজনে এরকম প্রায় চল্লিশটি গান লিখেছেন লেখক ভাস্কর চৌধুরী। বাংলা সাহিত্যে এটি একটি বাড়তি সংযোজন বলে আমি মনে করি।
রাজশাহী কিংবা ডুয়ার্সের আদিবাসী কোচ, মাহালি, মাহাতো, সাঁওতাল, ওঁরাও সম্প্রদায়ও বাদ গেল না পরিবর্তিত বিশ্বের গল্প থেকে। দুই লক্ষাধিক শব্দের এই উপন্যাসটি তিনি লেখেন বাটন মোবাইল ফোনে
তিনি লিখেছেন আরেকটি মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘শামুক’। ‘ধনসা মাতি ও তার জীবনবৃক্ষ’ যেখানে একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর ইতিহাস উপন্যাস, ‘শামুক’ সেখানে ভারতবর্ষ অতিক্রম করে বিশ্বের আখ্যান হয়ে উঠেছে। ইতিহাসকে এখানে মিথে রূপান্তরিত করা হয়েছে। পঞ্চাশের দশকে রাজশাহী অঞ্চলে যে গল্পের সূচনা, সেই গল্প ছড়িয়ে পড়ল বিশ্বে, কখনো ব্যবসা, কখনো যুদ্ধ-যুদ্ধশিশু, কখনো প্রেম, কখনো কল্পনার রেখাপাত ধরে। রাজশাহী কিংবা ডুয়ার্সের আদিবাসী কোচ, মাহালি, মাহাতো, সাঁওতাল, ওঁরাও সম্প্রদায়ও বাদ গেল না পরিবর্তিত বিশ্বের গল্প থেকে। দুই লক্ষাধিক শব্দের এই উপন্যাসটি তিনি লেখেন বাটন মোবাইল ফোনে। পাণ্ডুলিপি অবস্থাতেই আমার পড়ার সুযোগ হয়।
প্রায় ৫৩০পৃষ্ঠার উপন্যাস 'স্বপ্নজাল', পঞ্চাশের দশকে ঘরপালানো এক যুবকের গল্প। ষোল বছর বয়সে ভারত-বাংলাদেশে চোরাচালানে মুটে থেকে তার উত্থান। এরপর ভারববর্ষের শীর্ষ ব্যবসায়ী হয়ে ওঠে। তার কর্মের পরিধি ও বিস্তার ধরে আখ্যানে ভারত, থাইল্যান্ড, ইথিওপিয়া, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া, আলজেরিয়া, রাশিয়া, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব প্রভৃতি দেশের মানুষ ও রাজনীতি ঢুকে পড়েছে। ফিদেল কাস্ত্রো, ইন্দিরা গান্ধী, জেনারেল জিয়া, জেনারেল এরশাদ, শেখ হাসিনা প্রমুখ রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে উপন্যাসের প্রটাগনিস্ট সুব্রতের সাক্ষাৎ ঘটে। কাল্পনিক সেসব সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হয় ইতিহাসের বাকবদল।
ধর্ষণের শিকার তনুকে উৎসর্গ করে লিখেছেন ‘চার্জশীট’ নামের অসামান্য একটি উপন্যাস। এর আগে পরে তিনি লেখেন ‘লাল মাটি কালো মানুষ’ (১৯৯৮), ‘স্বপ্নপুরুষ’ (১৯৯৮), ‘মীমাংসা পর্ব’ (১৯৯৮), ‘আষাড়ুর জীবনদর্শন’ (১৯৯৯), ‘ভূমি’ (২০১১), ‘কৃষ্ণপুরাণ’ (২০১১), ‘কখনও কখনও এরকম ঘটে’ (২০১২), ‘যুদ্ধে যাবার সময়’ (২০১৩), ‘চোখের আলোয় দেখেছিলেম’ (২০১৫), ‘গন্তব্যহীন যাত্রা’ (২০১৫), ঘোরলাগা ঘোর (২০১৫) প্রভৃতি উপন্যাস।
‘রক্তপাতের ব্যাকরণ’ নামে তাঁর যে ছোটগল্পের বই, সেটা বাংলা ছোটগল্পে অনন্য গ্রন্থের মর্যাদা পেতে পারে। হাসান আজিজুল হকের পর আরো কোনো লেখক সম্ভবত এভােব রাঢ়বঙ্গকে বোঝেননি। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ হল: বাষট্টি বিঘা নদী (১৯৮৭), কোথায় নিবাস (১৯৮৭), পণের সময় (১৯৮৮), শনিবারের বৃষ্টি (১৯৯৯)। ছোটগল্পের পাশাপাশি ছিখেছেন অণুগল্পও। সংখ্যার বিচারে নিতান্তই কম না। বাছাই করে ‘বনসাই গল্প’ নামে অণুগল্পের একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
ভাস্কর চৌধুরী কথাসাহিত্য দিয়ে আলোচনা শুরু করলেও কবিতা ছিল তাঁর সাহিত্যচর্চার প্রধান বিষয়। সাহিত্যমহলে তাঁর পরিচিতিও কবিতা দিয়ে। বিশেষত ‘আমার বন্ধু নিরঞ্জন’-এর কবি হিসেবে তিনি বাংলাদেশ এবং কলকাতাতে খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে আছে: আমার কেবলই সমর্পণ (১৯৮৬), নিরঞ্জন আমার বন্ধুর নাম (২০১২), আমার ভেতরে আঁধার (২০১২), পরানের গহীন (২০১২), গেরিলার মুখ (২০১৩), আমার যতো ভালোবাসা (২০১৩), ভোরের কবিতা (২০১৩), আঁধার নেমে আসে (২০১৩), এলোমেলো (২০১৩), হেমন্ত কাব্য (২০১৬), টান (২০১৬), আমার মা কবি ছিলেন (২০১৬), এ কোনো সুখের সময় নয় (২০১৭), শব্দের সারি শব্দের বাড়ি (২০১৮), হাফপকেটে সন্ধ্যা বুকপকেটে তুমি (২০১৯) ইত্যাদি কাব্যগন্থ। কয়েকখণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে বছরভিত্তিক লেখা কবিতাসমূহ। অগ্রন্থিত আছে অসংখ্য কবিতা। অন্যান্য গদ্যগ্রন্থের মধ্যে লিখেছেন ষাট ও সত্তর দশকের স্মৃতিকথামূলকগ্রন্থ ‘মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ’ এবং প্রবন্ধগ্রন্থ ‘সাহিত্য তত্ত্ব ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’।
হিসেব করলে দেখা যাবে কম লেখেননি তিনি। লেখক হিসেবে তাঁর সময়ের অনেক লেখকের চেয়ে অগ্রবর্তী মানুষ ছিলেন। কিন্তু সেই অর্থে তাঁর প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতি তাঁকে দেওয়া হয়নি। এর কারণ মূলত সাহিত্যের রাজনীতি। এক্ষেত্রে ভাস্কর চৌধুরীর কোনো ব্যর্থতা নেই, ব্যর্থতা আমাদের সাহিত্যসমাজের। ভাস্কর চৌধুরী একেবারে লোকচক্ষুর আড়ালে ছিলেন না। তিনি রাজধানীতেই থাকতেন। আশি ও নব্বই দশকের প্রভাবশালী কবিরা তাঁকে শুধু চিনতেনই না, কারো কারো ঘনিষ্ঠ বন্ধুও ছিলেন। কিন্তু তারপরও কেউ ভাস্কর চৌধুরীকে তাঁর উপযুক্ত সম্মানটুকু প্রাপ্তিতে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। দেশে বাংলা একাডেমিসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কারের প্রচলন আছে। তিনি যোগ্য দাবিদার হওয়া সত্বেও তাঁর নাম কোথাও উচ্চারিত হতে শুনিনি। অবশ্য এ নিয়ে কিছুটা হতাশা থাকলেও কখনো কোনো লেখকবন্ধুর কাছে সেটা প্রকাশ করেননি তিনি। সাহিত্যের সভা-সমিতি এড়িয়ে বছরের পর বছর নিজের কক্ষে বসে থেকে আপনধ্যানে কবিতা লিখে গেছেন। তাঁর সমস্ত কবিতাতে উচ্চারিত হয়েছে প্রেম ও দ্রোহের বাণী। তিনি নানাভাবে, বিভিদ ভঙ্গিতে, ভিন্ন ভিন্ন স্বরে বলে গেছেন:
‘মানুষকে এত ক্ষুদ্রার্থে নেবেন না,
মানুষ এত বড় যে,
আপনি যদি ‘মানুষ’ শব্দটি
একবার উচ্চারণ করেন
যদি অন্তর থেকে করেন উচ্চারণ
যদি বোঝেন এবং উচ্চারণ করেন ‘মানুষ’
তো আপনি কাঁদবেন।
আমি মানুষের পক্ষে,
মানুষের সঙ্গে এবং মানুষের জন্যে।
আমি শুনেছি নিরঞ্জন বলছে,
তুমি দুস্কৃতি মারো, গেরিলা-তামিল মারো
এভাবে যেখানে যাকেই মারো না কেন
ইতিহাস লিখবে যে এত মানুষ মরেছে
বড়ই করুণ এবং বড়ই দুঃখজনক
শক্তির স্বপ্নে তুমি যারই মৃত্যু উল্লেখ করে
উল্লাস করো না কেন
মনে রেখো মানুষই মরেছে
এই ভয়ঙ্কর সত্য কথা নিরঞ্জন বলেছিল...’
[আমার বন্ধু নিরঞ্জন]





