পুকুরে মাছের সঙ্গে ঝিনুকে মুক্তা
- গোপালগঞ্জে ছয় পুকুরে ৭,৮০০ ঝিনুকে প্রায় ১৭,৪০০ মুক্তা সংগ্রহ
- মাছের সঙ্গে মুক্তা উৎপাদন করে অতিরিক্ত আয় সম্ভব

ঝিনুক নীরবে সহো/ঝিনুক নীরবে সহো,/ঝিনুক নীরবে সহে যাও/ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুঁজে মুক্তা ফলাও! —আবুল হাসান। ‘বিষের বালি’র যন্ত্রণা সহ্য করে মুক্তা ফলায় ঝিনুক। শুধু প্রাকৃতিকভাবেই নয়, কৃত্রিমভাবেও তৈরি করা যায় মুক্তা। এভাবে উৎপাদন হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। আবার একই পুকুরে মাছ চাষের পাশাপাশি ঝিনুক থেকে উৎপাদন করা হচ্ছে মুক্তা। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় পরীক্ষামূলক এই উদ্যোগে মিলেছে সাফল্য। এতে মাছ চাষের সঙ্গে একই জলাশয় থেকে বাড়তি আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মৎস্য বিভাগের তথ্য বলছে, দেশীয় প্রজাতির মাছ এবং শামুক সংরক্ষণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কোটালীপাড়ায় ছয়টি পুকুরে মুক্তা উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব পুকুরে ৭ হাজার ৮০০টি ঝিনুকে ইমেজ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে চাষ শুরু করা হয়। পরীক্ষার পর সেখান থেকে প্রায় ১৭ হাজার ৪০০টি ইমেজ মুক্তা সংগ্রহ করা হয়।
মৎস্য কর্মকর্তাদের ভাষ্য, উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এক একর আয়তনের একটি পুকুরে প্রায় ২০ হাজার ঝিনুক রাখা সম্ভব। ঝিনুকের জন্য আলাদা খাবার দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। পানিতে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনই এর প্রধান খাদ্য। ফলে পুকুরে পর্যাপ্ত ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন থাকলে মাছের পাশাপাশি ঝিনুকও চাষ করা যায়।
কোটালীপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা এস এম শাহজাহান সিরাজের ভাষায়, মাছের সঙ্গে একই পুকুরে ঝিনুক রেখে মুক্তা উৎপাদন করা সম্ভব। এতে একই জলাশয় থেকে মাছের পাশাপাশি মুক্তিও পাওয়া যায়। এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে জেলার পাঁচ উপজেলা থেকে পাঁচজন করে ২৫ জন উদ্যোক্তাকে নিয়ে দল গঠন করেছিল মৎস্য বিভাগ। তাদের মুক্তা চাষের ওপর প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ গত জুনে শেষ হওয়ার পর সরকারি
সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে কোটালীপাড়ার দুটি পুকুরে মুক্তা চাষ চালু রয়েছে। তবে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই এই খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাবে না। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম জানিয়েছেন, গোপালগঞ্জের পাঁচ উপজেলায় ১৯ হাজার ৪৮২টি পুকুর রয়েছে। এসব জলাশয়ে মুক্তা চাষের সুযোগ রয়েছে। চাষিদের এ বিষয়ে উৎসাহিত করা হলেও উৎপাদিত মুক্তা বিক্রির নিশ্চয়তা না থাকায় অনেকে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন না।
বর্তমানে দেশে হাতেগোনা কয়েকটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান মুক্তা কিনছে। ফলে উৎপাদনের পর বাজারজাত করা উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য নিশ্চিত ক্রেতা ও ন্যায্যদাম না থাকলে এ ধরনের চাষে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করা কঠিন।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, গোলাকার মুক্তা উৎপাদনে তুলনামূলক বেশি সময় লাগে। তবে ইমেজ মুক্তা কম সময়ে উৎপাদন করা যায়। ফলে মাছের সঙ্গে একই পুকুরে ইমেজ মুক্তার চাষ বাড়তি আয়ের একটি সম্ভাবনাময় পথ হতে পারে। উৎপাদনের পাশাপাশি মুক্তার স্থায়ী বাজার, বিপণনব্যবস্থা ও ক্রেতা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা গেলে গোপালগঞ্জে এ চাষের পরিধি বাড়ানো সম্ভব। মানসম্মত মুক্তা উৎপাদনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও নতুন একটি খাত হিসেবে এর বিকাশ ঘটতে পারে।



