খসে পড়ছে সেতু, কত কাছে মৃত্যু

ভোর হতেই চাকা ঘোরে যানবাহনের। ওপরে জীবন বাঁচানোর টানাপড়েন, নিচে উত্তাল দুধকুমার নদ। আর মাঝখানে কাঁপতে থাকে ১৪০ বছরের জরাজীর্ণ সোনাহাট সেতু। প্রতিটি মুহূর্তে এখানে মৃত্যু যেন দেয় হাতছানি। লোহার পাটাতন নড়বড়ে। খুলে পড়েছে নাট-বল্টু। তবুও বিকল্প পথ নেই। ঝুঁকি নিয়েই পার হচ্ছে বাস, পাথরবোঝাই ট্রাক, অটোরিকশাসহ নানান যানবাহন। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সেই ১৮৮৭ সালে ব্রিটিশ শাষণামলে তৈরি সেতুটি। এর ১০০ বছরের আয়ুষ্কাল ফুরিয়েছে চার দশক আগে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ১৯৮৬ সালে করা হয় সংস্কার। এর পর থেকে চলছে শুধু জোড়াতালির মেরামত।
সম্প্রতি স্টিলের পাটাতন যায় দেবে। বন্ধ হয়ে পড়ে ভারী যান চলাচল। পরে সাময়িক মেরামত করে একমুখী চলাচলের ব্যবস্থা হয়। ফলে সেতুর দুই প্রান্তে প্রতিদিন জমছে দীর্ঘ যানজট।
পাশে নতুন সেতু তৈরির কাজ চলছে। দুই বছরে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সাত বছরেও তা শেষ হয়নি। সময় বেড়েছে চার দফায়। প্রকল্প ব্যয়ও বেড়েছে প্রায় ৭ কোটি টাকা।
পশ্চিম প্রান্তের সংযোগ সড়ক প্রায় প্রস্তুত। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় থমকে আছে পূর্ব প্রান্তের কাজ। মূল সেতুর শেষ অংশের নির্মাণও ঝুলে আছে।
ফলে দুধকুমার নদের পূর্ব প্রান্তের সাতটি ইউনিয়নের লাখো মানুষ চরম দুর্ভোগে। স্থবির হয়ে পড়েছে সোনাহাট স্থলবন্দরের পণ্য পরিবহন। ব্যবসায় নেমে এসেছে ধস। শুধু তাই নয়, যেকোনো মুহূর্তে জরাজীর্ণ সেতুটি ভেঙে ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের প্রাণহানি।
সরেজমিনে দেখা যায়, পুরনো বেইলি সেতুটির বিভিন্ন স্থানে লোহার পাটাতন ভেঙে গেছে। কোথাও কোথাও লোহার পাত খুলে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করা হলেও কিছুদিন পর আবার তা নষ্ট হয়ে যায়। এর মধ্যে এ সেতু দিয়ে পাথরবোঝাই ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, বাস, অটোরিকশা, ইজিবাইকসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গত রবিবার সেতুটির স্টিলের একটি পাটাতন দেবে যাওয়ায় ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে মেরামতের জন্য সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়। ঝুঁকি এড়াতে সেতুটিতে একসঙ্গে দুই দিকের যানবাহন চলাচলও বন্ধ রাখা হচ্ছে। ফলে একমুখী গাড়ি চলাচলের কারণে প্রতিদিন ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকরা।
কুড়িগ্রাম সওজের কর্মকর্তারা জানালেন, পুরনো সেতুর দক্ষিণ পাশে ২০১৯ সালে দুধকুমার নদের ওপর ৬৪৫ দশমিক শূন্য ১৫ মিটার দীর্ঘ নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ১৩৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকা চুক্তিমূল্যের সেতু ও সংযোগ সড়কের কাজ ২০২১ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জমি অধিগ্রহণে জটিলতা, নকশা পরিবর্তন, করোনাকালে স্থবিরতা এবং নির্মাণকাজে ধীরগতির কারণে চার দফা সময় বাড়ানো হয়েছে। প্রকল্প ব্যয়ও বেড়েছে প্রায় ৭ কোটি টাকা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় পুরনো ও জরাজীর্ণ সেতু দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলছে যানবাহন। এতে ভোগান্তিতে পড়েছে দুধকুমার নদের পূর্ব প্রান্তের তিনটি ইউনিয়ন ও কচাকাটা থানার চারটি ইউনিয়নের লাখো মানুষ এবং পণ্যবাহী যানবাহন।
সোনাহাট স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন ব্যাপারী বললেন, ভাঙা ও নড়বড়ে সেতু দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে। এতে আমদানি করা পণ্য পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে। নতুন সেতুর কাজ বিলম্বিত হওয়ায় ব্যবসায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
কুড়িগ্রাম সওজের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মেহেদী হাসান সরকার জানালেন, সোনাহাট সেতুর দেবে যাওয়া পাটাতন মেরামত করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পাটাতনগুলো নিয়মিত মেরামত করে যান চলাচল সচল রাখা হচ্ছে। আর ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় নির্মাণাধীন সেতুর পূর্ব প্রান্তের অ্যাপ্রোচ সড়কের কাজ শেষ হয়নি।



