জামালপুর
১২ হাজার অটোর চার্জিংয়ে বিদ্যুতের বাড়তি চাপ

ছবি: আগামীর সময়
প্রচণ্ড গরম ও ভ্যাপসা আবহাওয়ার মধ্যে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জামালপুরের জনজীবন। শহর ও আশপাশের এলাকায় চলাচল করা ১২ হাজারের বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের ব্যাটারি চার্জে প্রতিদিন ৭০ থেকে ৯০ হাজার ইউনিট, অর্থাৎ প্রায় ১২ থেকে ১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিমাণ বিদ্যুৎ একটি উপজেলার দৈনিক চাহিদার কাছাকাছি। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গ্যারেজ ও ঘরবাড়িতে একসঙ্গে শত শত অটোরিকশা চার্জ দেওয়ায় বিদ্যুতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় জেলার সাতটি উপজেলা ছাড়াও শেরপুরের কিছু অংশ, কুড়িগ্রামের রাজীবপুর ও রৌমারী এবং সিরাজগঞ্জের কয়েকটি এলাকা রয়েছে। এসব এলাকায় গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৭৫ হাজার। প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা ১৭০ থেকে ১৮০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে গড়ে ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে প্রতিদিন প্রায় ৯০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি থাকছে।
অন্যদিকে, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) অধীনে জামালপুর শহর, সরিষাবাড়ী, ইসলামপুর ও মেলান্দহ উপজেলার প্রায় ৭৮ হাজার গ্রাহক রয়েছেন। এসব এলাকায় প্রতিদিন বিদ্যুতের প্রয়োজন প্রায় ৩০ থেকে ৩২ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও গ্যারেজ মালিকদের তথ্য মতে, একটি অটোরিকশায় সাধারণত ১৫ অ্যাম্পিয়ারের চার থেকে পাঁচটি ব্যাটারি থাকে। এসব ব্যাটারি চার্জ করতে প্রতি ঘণ্টায় এক থেকে দেড় ইউনিট বিদ্যুৎ লাগে। একটি অটোরিকশার ব্যাটারি পূর্ণ চার্জ দিতে ছয় থেকে আট ইউনিট বা তারও বেশি বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। এ হিসাবে ১২ হাজারের বেশি অটোরিকশা প্রতিদিন চার্জ দিতে ৭০ থেকে ৯০ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
অটোরিকশার অধিকাংশ ব্যাটারি গ্যারেজ কিংবা ঘরবাড়িতে চার্জ দেওয়া হয়। সাধারণত প্রতিটি অটোরিকশা চার্জ দিতে ১০০ থেকে ১২০ টাকা নেওয়া হয়। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা চার্জে বসানো হলে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায়। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। বিদ্যুতের এই ঘাটতির কারণে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
শহরের বসাকপাড়া এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাসায় ফ্যান চালানোর মতো বিদ্যুৎ থাকে না, গরমে বাচ্চারা ঘুমাতে পারে না। যদি দেখা যায় ১ ঘণ্টা কারেন্ট থাকলে ২ ঘণ্টায় থাকে না। অথচ বিদ্যুৎ যতটুকু সময় থাকে, সে সময়ে গ্যারেজে সারি সারি অটোরিকশা চার্জ হচ্ছে।’
জামালপুর পৌর শহরের পাথালিয়া এলাকার বাসিন্দা মমিন শেখ ও এফ জেড রাসেল বলেন, ‘হিসাব ছাড়াই দিনরাত বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ সংকটের এই সময়ে, বিশেষ করে সন্ধ্যার পিক আওয়ারে চার্জিং নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে লোডশেডিং কমানো কঠিন হবে।’
তবে অটোরিকশাচালকদের দাবি, জীবিকার তাগিদেই তারা এসব যান চালান।
অটোরিকশাচালক মো. সোলাইমান ও সোহেল মিয়া জানান, সারাদিন যা আয় হয়, তার বড় অংশই চার্জিংয়ে চলে যায়। প্রতিটি যান চার্জ দিতে গ্যারেজে ১০০ থেকে ১২০ টাকা দিতে হয়। বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তারা বাধ্য হয়েই এভাবে চার্জ দিচ্ছেন। সরকার যদি নির্ধারিত সময়ে বা আলাদা স্টেশনে চার্জিংয়ের ব্যবস্থা করতেন, তাহলে তারা সেই নিয়ম মেনে অটোরিকশা দিতে রাজি আছেন বলেও জানান তারা।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, অটোরিকশা এখন গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনমাধ্যম হলেও নিয়ন্ত্রণহীন চার্জিং ব্যবস্থা বিদ্যুতের ওপর বাড়তি চাপ ফেলছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এসব যানের নিবন্ধন, অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন তৈরি এবং পিক আওয়ারে চার্জিং সীমিত করার দাবি জানিয়েছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
সার্বিক বিষয়ে জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) মো. সাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বিদ্যুতের চাহিদার বড় অংশই ইজিবাইক চার্জে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে সরকারও ভাবছে এবং ভালো কোনো সমাধানের চেষ্টা চলছে।’
জামালপুর পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (পিডিবি) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মহিবুল আজাদ রুবেল বলেন, ‘আমরা মিটার বসিয়ে অটোচার্জিংয়ের নির্ধারিত হারে বিল আদায় করে যাচ্ছি।’






