ওমরাহ যাত্রীদের কোটি টাকা নিয়ে উধাও দুই পীরজাদা

বাঁ থেকে হাম্মাম চৌধুরী ও বাকী বিল্লাহ মিশকাত চৌধুরী
ওমরাহ যাত্রীদের প্রায় দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার ঐতিহাসিক সাদ্রা দরবার শরিফের দুই পীরজাদার বিরুদ্ধে।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ওমরাহ কাফেলার প্রধান মওলানা মো. গোলাম মাওলা চেক ডিজঅনারের মামলা করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, নিবন্ধনবিহীন ‘এসবি ওভারসিজ’ নামের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আরও অনেকের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে বর্তমানে তারা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছেন।
অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন পীরজাদা হাম্মাদ চৌধুরী ও বাকী বিল্লাহ মিশকাত চৌধুরী।
সম্প্রতি ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে, মামলার নথি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে দেওয়া অভিযোগ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কচুয়া উপজেলার আইনগিরি গ্রামের বাসিন্দা মওলানা মো. গোলাম মাওলা বিভিন্ন সূত্রে হাম্মাদ ও মিশকাত চৌধুরীর সঙ্গে পরিচিত হন। এর আগে তিনি বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে ওমরাহ যাত্রী সৌদি আরবে পাঠিয়েছেন। পীরজাদা হিসেবে তাদের প্রতি আস্থা রেখে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ওমরাহ যাত্রী পাঠানোর জন্য আর্থিক লেনদেন শুরু করেন।
গোলাম মাওলার দাবি, ৬৫ জন ওমরাহ যাত্রীর জন্য তিনি নগদ ও ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে মোট ৯৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। এর একটি অংশ হাম্মাদ চৌধুরীর ব্যাংক হিসাবে এবং বাকি অর্থ নগদে তার বাবা মুহাম্মদ জাকারিয়া চৌধুরীর হাতে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মওলানা গোলাম মাওলা বলেছেন, ২০২৫ সালের ১৪ জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত হাম্মাদ ও মিশকাত তার কাছ থেকে অর্থ নিলেও নির্ধারিত সময়ে যাত্রী পাঠাতে পারেননি। এতে সন্দেহ তৈরি হলে তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ‘এসবি ওভারসিজ’ নামের প্রতিষ্ঠানটির কোনো বৈধ নিবন্ধন নেই।
তার ভাষ্য, যাত্রী পাঠাতে ব্যর্থ হওয়ার পর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তাকে ভুয়া ভিসা ও বিমান টিকিট সরবরাহ করেন। পরে অর্থ ফেরতের আশ্বাস দিয়ে ইসলামী ব্যাংকের ২০ লাখ ও ২৫ লাখ টাকার দুটি চেক দেন। তবে হিসাব নম্বরে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় চেক দুটি ডিজঅনার হয়। এ ঘটনায় হাম্মাদ চৌধুরীকে আসামি করে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস (এনআই) অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় পৃথক দুটি মামলা করেন তিনি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, মামলার নির্ধারিত শুনানিতে হাম্মাদ চৌধুরী উপস্থিত হননি। বর্তমানে হাম্মাদ ঢাকায় আত্মগোপনে এবং মিশকাত চৌধুরী বিদেশে অবস্থান করছেন। বিষয়টি তিনি জেলা প্রশাসককে মৌখিকভাবে এবং পুলিশ সুপারের কাছে লিখিতভাবে জানিয়েছেন।
গোলাম মাওলা দাবি করেছেন, সামাজিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করেও তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। অনেক ওমরাহ যাত্রীর অর্থ আটকে থাকায় তিনি এখন চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। যাত্রীরা অর্থও ফেরত পাচ্ছেন না, আবার ওমরাহ পালনেও যেতে পারছেন না।
আরেক ভুক্তভোগী, কুমিল্লার মুরাদনগরের নছরুল্লাহ হুসাইন অভিযোগ করেছেন, তার ১৭৬ জন ওমরাহ যাত্রীর ভিসা ও বিমান টিকিটের জন্য মিশকাত চৌধুরী এবং তার দুই ভাই হাম্মাদ ও ইয়াহিয়া চৌধুরীর ব্যাংক হিসাবে মোট ১ কোটি ৪ লাখ টাকা নেওয়া হয়। কাজ সম্পন্ন না করায় তাকে ৭৫ লাখ টাকার দুটি চেক দেওয়া হয়েছিল। চেকগুলো ডিজঅনার হওয়ায় তিনি কুমিল্লার আদালতে পৃথক দুটি মামলা করেছেন।
নছরুল্লাহ হুসাইন দাবি করেছেন, খুব শিগগিরই মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হতে পারে। তার অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও অনেক ব্যক্তি একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে হাম্মাদ চৌধুরী ও মিশকাত চৌধুরীর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা সাড়া দেননি। খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ফলে তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে হাম্মাদ ও মিশকাতের বাবা মুহাম্মদ জাকারিয়া চৌধুরী জানিয়েছেন, তার ছেলেরা প্রাপ্তবয়স্ক এবং নিজেদের ব্যবসা নিজেরাই পরিচালনা করেন। এসব বিষয়ে তাকে জড়ানো হচ্ছে কেন, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তার দাবি, নগদ অর্থ গ্রহণের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং তার সঙ্গে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়নি। এসব ঘটনার কারণে বর্তমানে ছেলেদের সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই।
হাজীগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, এ বিষয়ে হাজীগঞ্জ থানা ও কোর্টে দুটি মামলা হয়েছে। মামলার ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।






