৫৫ বছরেও হয়নি সেতু, রশি টেনে নৌকায় পারাপার

কাপাসিয়া ও নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার সংযোগস্থলে রশি টান দিয়ে এভাবেই পার হতে হয়। ছবি: আগামীর সময়
এক হাতে রশি ধরে টান, অন্য হাতে নৌকার নিয়ন্ত্রণ। এভাবেই নদ পারাপার করতে হচ্ছে মানুষকে। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও নির্মিত হয়নি স্থায়ী সেতু। ফলে গাজীপুরের কাপাসিয়া ও নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার সংযোগস্থলে প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন দুই পাড়ের বাসিন্দারা।
শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও কর্মজীবী মানুষের যাতায়াতে ভোগান্তি এখন নিত্যদিনের সঙ্গী। দীর্ঘদিন ধরে সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয়রা। তবে এখনো এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার টোক ইউনিয়নের পাঁচুয়া হাজী বাজারের গঙ্গা ঘাটে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের একটি শাখার ওপর স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। নদীর এক পাড়ে নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার লেবুতলা ইউনিয়নের ঝাঁড়তলা বাজার, অন্য পাড়ে কাপাসিয়ার পাঁচুয়া হাজী বাজার। দুই জেলার মানুষের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ এই স্থানে সেতু না থাকায় রশি টেনে নৌকায় পারাপারই একমাত্র ভরসা।
সরেজমিন দেখা যায়, টোক-আড়ালিয়া থেকে বারিষাব ইউনিয়নগামী সড়কের গঙ্গা বাজার থেকে পূর্ব দিকে নিচে নেমে যেতে হয় গঙ্গা ঘাটে। নদীর পাড়ে যাওয়ার জন্য নেই প্রশস্ত সড়ক কিংবা পাকা ঘাট। এপার থেকে ওপার পর্যন্ত টানানো আছে একটি লম্বা রশি। সেই রশির সঙ্গে বাঁধা কাঠের নৌকায় চলছে মানুষের পারাপার। যাত্রী ওঠার পর রশি টেনে নৌকাটি এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে নিয়ে যান মাঝি।
পাঁচুয়া গ্রামের নৌকার মালিক আসাদ বললেন, ‘প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই ঘাট দিয়ে মানুষ পারাপার হয়। আমি নিজেই রশি টেনে নৌকা চালাই। কেউ পাঁচ টাকা দিলে নিই, না দিলেও বিনা ভাড়ায় পার করে দিই। এ নৌকার আয় দিয়েই আমার সংসার চলে। এখানে একটি সেতু নির্মাণ করা হলে দুই উপজেলার মানুষের যোগাযোগ বাড়বে, যাতায়াতও সহজ হবে।’
স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন নানা প্রয়োজনে দুই পাড়ের মানুষ এই ঘাট দিয়ে নদ পার হন। নৌকা রশি টেনে চালাতে হওয়ায় পারাপারে সময় ও শ্রম দুটোই বেশি লাগে। নদে পানি বাড়লে কিংবা আবহাওয়া প্রতিকূল হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, বয়স্ক ব্যক্তি ও অসুস্থ রোগীদের যাতায়াতে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
সেতু না থাকায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত, রোগীদের চিকিৎসাসেবা নেওয়া এবং কৃষকদের উৎপাদিত ফসল বাজারজাত করতে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। নৌকার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় পণ্য পরিবহনে বাড়তি সময় ও খরচ গুনতে হয়। এতে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আড়ালিয়া এলাকার বাসিন্দা মুজিবুর রহমান বললেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমরা এই ঘাট দিয়ে নৌকায় নদ পারাপার হচ্ছি। বর্ষাকালে নদের পানি বাড়লে পারাপার আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে শিশু, নারী ও বয়স্ক মানুষকে নিয়ে চলাচলে অনেক কষ্ট হয়। এখানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হলে দুপাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমবে।’
হাফেজ আব্দুস সাত্তার বলেছেন, ‘আমরা দুই উপজেলার হাজার হাজার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে একটি সেতুর দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই দাবি বাস্তবায়িত হয়নি। শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের দাবি, দ্রুত এখানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হোক।’
সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, সেতু নির্মাণ করা হলে মনোহরদী এলাকার বাসিন্দারা মাওনা-শ্রীপুর হয়ে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ পাবেন। এতে স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি আশপাশের এলাকার মানুষের যাতায়াতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
এ বিষয়ে কাপাসিয়া উপজেলা প্রকৌশলী সোহেল রানা জানিয়েছেন, পাঁচুয়া হাজী বাজারের গঙ্গা ঘাটে স্থায়ী সেতু নির্মাণ স্থানীয় মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেতুটি নির্মাণ করা গেলে গাজীপুরের কাপাসিয়া ও নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হবে। তবে এ ধরনের সেতু নির্মাণের আগে প্রয়োজনীয় কারিগরি সমীক্ষা, সম্ভাব্যতা যাচাই ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।




