১১০ বছরের চাবির গল্প

১১০ বছরের ইতিহাস, একটি পরিবারের চার প্রজন্মের শ্রম, দক্ষতা আর পেশার প্রতি অটুট ভালোবাসার কাহিনি, ছবি : আগামীর সময়
কক্সবাজার শহরের বাজারঘাটা মসজিদ রোডের মাথা। পৌরসভা মার্কেটের সামনে ফুটপাতের ওপর ছোট্ট একটি দোকান। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ একটি চাবির দোকান বলেই মনে হবে। কিন্তু একটু কাছে গেলেই চোখ আটকে যায় দেয়ালজুড়ে ঝুলে থাকা অসংখ্য চাবিতে। ছোট-বড়, পুরোনো-নতুন, নানা ধরনের চাবির পাশাপাশি সাজানো রয়েছে চাবি তৈরির যন্ত্রপাতি আর ধাতব সরঞ্জাম।
তবে এই ছোট্ট দোকানের গল্প শুধু তালা-চাবির নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কক্সবাজার শহরের প্রায় ১১০ বছরের ইতিহাস, একটি পরিবারের চার প্রজন্মের শ্রম, দক্ষতা আর পেশার প্রতি অটুট ভালোবাসার কাহিনি।
দেশ স্বাধীন হওয়ারও বহু আগে প্রায় ১১০ বছর পূর্বে এই পেশার যাত্রা শুরু করেছিলেন মকবুল আহমদ কন্ট্রাক্টর। জীবনের প্রায় ৭০ বছর চাবি তৈরির কাজ করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন কক্সবাজারের মানুষের আস্থার নাম। তার হাত ধরেই যাত্রা শুরু হয় এই দোকানের। ১৯৮০ সালের দিকে বাবার কাছ থেকে দোকানের দায়িত্ব নেন ছেলে আব্দুল কাদের। তারপর কেটে গেছে প্রায় ৪৬ বছর। বাবার শেখানো দক্ষতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে আজও প্রতিদিন দোকানের বেঞ্চে বসে মানুষের প্রয়োজন মেটাচ্ছেন তিনি।
দোকানের সামনে বসে কাজ করতে করতে আব্দুল কাদের বললেন, আমার বাবা এই কাজ শুরু করেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই বাবার পাশে বসে কাজ শিখেছি। পরে ১৯৮০ সাল থেকে দোকানের দায়িত্ব নিই। এত বছর ধরে কত মানুষের চাবি বানিয়েছি, তার হিসাব নেই।
একসময় চাবি তৈরির পুরো প্রক্রিয়াই ছিল হাতে-কলমে। পুরোনো চাবি দেখে, মেপে, ঘষে-ঘষে নতুন চাবি তৈরি করতে হতো। এতে যেমন সময় লাগত, তেমনি প্রয়োজন হতো দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও নিখুঁত দক্ষতার।
সময় বদলেছে, বদলেছে প্রযুক্তিও। প্রায় ১৫ বছর আগে আধুনিক মেশিন ও নতুন যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করেন আব্দুল কাদের। এখন আগের তুলনায় অনেক দ্রুত ও নিখুঁতভাবে চাবি তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। তবে আধুনিক প্রযুক্তি এলেও হারিয়ে যায়নি ঐতিহ্যের ছাপ।
দোকানটিতে এখনও যত্ন করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে প্রায় ১১০ বছর আগের কিছু চাবি। ধাতব সেই পুরোনো চাবিগুলো যেন শুধু একটি বস্তু নয় বরং একটি পরিবারের ইতিহাস আর কক্সবাজার শহরের সময়ের সাক্ষী।
আব্দুল কাদের বলেছেন, আগের দিনের অনেক চাবি এখনও আমার কাছে আছে। এগুলো দেখলে বাবার কথা মনে পড়ে। তখনকার সময়ের কাজ আর এখনকার কাজের মধ্যে অনেক পার্থক্য। কিন্তু মানুষের প্রয়োজন মেটানোর মূল কাজটা একই রয়ে গেছে।
ঘরের দরজা, অফিস, দোকান কিংবা গুরুত্বপূর্ণ আলমারির চাবি হারিয়ে গেলে মানুষের প্রথম ভরসা এই ছোট্ট দোকান। কেউ পুরোনো চাবি নিয়ে আসেন, কেউ শুধু তালা। অভিজ্ঞ হাতের স্পর্শে তালা দেখে তৈরি হয়ে যায় নতুন চাবি। প্রয়োজন হলে মোটরসাইকেল কিংবা গাড়ির চাবিও বানিয়ে দেন আব্দুল কাদের।
প্রতিদিন গড়ে ১৫০ থেকে ২০০টি পর্যন্ত চাবি তৈরি হয় এই দোকানে। চাবির ধরন ও মানভেদে প্রতিটির দাম ২০ টাকা থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। দৈনিক আয় কখনো ৫০০ টাকা, আবার কখনো ৫ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়।
তবে এই দোকানের মূল্য শুধু অর্থনৈতিক নয়। বহু দশক ধরে কক্সবাজার শহরের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এটি। হারানো চাবির উদ্বেগ, ভাঙা তালার সমাধান কিংবা পুরোনো চাবির হুবহু প্রতিলিপি। সবকিছুর নির্ভরতার জায়গা হয়ে উঠেছে এই ছোট্ট দোকান।
এখন সেই ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন একটি অধ্যায়। দোকানের এক পাশে দাঁড়িয়ে হাতে-কলমে কাজ শিখছেন আব্দুল কাদেরের নাতি আতিক ইসলাম অভি। দাদার কাছ থেকেই শিখছেন মেশিন চালানো, চাবির মাপ বোঝা, তালার গঠন বিশ্লেষণ এবং নিখুঁতভাবে নতুন চাবি তৈরির কৌশল।
আতিক ইসলাম অভি বলেছেন, দাদার কাছ থেকেই কাজ শিখছি। ছোটবেলা থেকেই এই দোকানে আসা-যাওয়া। এখন অনেক কাজ নিজেই করতে পারি। ভবিষ্যতে এই পেশাটাকে ধরে রাখতে চাই।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ধীরে ধীরে অবসরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন আব্দুল কাদের। একসময় হয়তো তিনি আর দোকানে বসবেন না। তার জায়গায় বসবেন নাতি। তখন মকবুল আহমদ কন্ট্রাক্টরের হাত ধরে শুরু হওয়া এই পথচলা পৌঁছে যাবে চতুর্থ প্রজন্মে।




