গালির আধিক্য কীসের ইঙ্গিত?

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বন্ধু-বান্ধবের আদুরে মুহূর্তের ‘গালি’ নিয়ে নয়, এই আলোচনা ক্ষমতা প্রদর্শনের সমকালীন কুরুচিপনা নিয়ে। চারদিকে এখন সে রকম গালিগালাজের বেশ আধিক্য। এর বড় আড়তে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
অনেক স্বঘোষিত সুশীলও গালি ছাড়া স্বাভাবিক শব্দে কিছু বলতে পারছেন না। মনে হচ্ছে, শ্রোতা-দর্শক-পাঠক তৃপ্ত করতে চরম সংকটে পড়ে গেছেন তারা। কেন সমাজের এ দশা? নানাজন এর কারণও তুলে ধরছেন।
ছাত্রাবস্থায় থার্ড ইয়ারে আমাদের একটি কোর্স ছিল সাইকোলজি। ওই একটি কোর্সের বেশি আর সাইকোলজি পড়া হয়নি। ১০০ নম্বরের জন্য যতটুকু পড়া আর কি।
তবে কোর্সের গৎবাঁধা মূল টপিকগুলোর ফাঁকে ম্যাডাম গালিকেন্দ্রিক আবেগজনিত সংকট নিয়ে যা বলছিলেন, অনেক বছর পর সেটা মনে পড়ছে।
কুরুচিপূর্ণ শব্দের ব্যবহার নিয়ে মনোবিজ্ঞানে অনেক ব্যাখ্যা। খুব কম ব্যাখ্যায় এটাকে হঠাৎ মেজাজ হারানো হিসেবে দেখা হয়। বরং বলা হয়েছে, একে মানসিক অসুস্থতা বা ক্ষমতার বিকার হিসেবে দেখাই বিজ্ঞানসম্মত। তবে এর রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে মনোবিজ্ঞান অল্প ইঙ্গিত দেয় বলেই আজকের দিনে এসে মনে হচ্ছে।
গালির ধরন সব সমাজে একরকম নয়। পশ্চিমে যদি গায়ের রঙ ও জাতি পরিচয় চরমতম গালির বিষয় হয়— বঙ্গে সেরকম ঘটে ধর্ম বা যৌনাত্মক প্রসঙ্গ তুলে। যেখানে যে বিষয় বেশি স্পর্শকাতর গালি তৈরি হয়, তাকে ব্যবহার করে।
সচেতন বক্তাদের গালির লক্ষ্য থাকে সর্বত্র কাছাকাছি। ‘তুমি আর আমি’; ‘আমরা বনাম তোমরা’ প্রাচীর তোলা ও ক্ষমতা প্রদর্শন। ‘অপর’কে কোণঠাসা করা। অর্থাৎ রাজনৈতিক বিবেচনায় গালিগালাজের চলতি আগ্রাসনের পেছনে সুনির্দিষ্ট রাজনীতিও আছে।
মনোবিজ্ঞান অবশ্য মনে করে, এই ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তি সামাজিকতার সংকটে আছে, যা তার স্বাভাবিক কাজের ক্ষমতা ধীরে ধীরে বিকৃত করছে। এটা সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিদেরও স্নায়বিক ক্ষতি করে, যারা এর মুখোমুখি হয়। শিকার হয়। গালিগালাজের শিকার ব্যক্তি একপর্যায়ে নিজের সৃষ্টি ও স্বাভাবিকতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়তে পারেন। ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে যাকে মানসিক নির্যাতনের ‘গ্যাস লাইটিং’ পদ্ধতি বলা হয়। প্রায় ৯ দশক আগে এক নাটকের প্লট থেকে এই পদ্ধতির জন্ম— যেখানে ধূর্ত ব্যক্তি গ্যাস লাইটের আলো কমিয়ে-বাড়িয়ে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করছিল। তখন থেকে কথায় প্রতারণার কৌশলে মনোবিদ্যার ওই নজিরের উল্লেখ চলছে।
গ্যাস লাইটিং কারসাজিকারীরা ভুক্তভোগীকে মনে করাতে চায়, তার সহজাত বোধবুদ্ধিতে সমস্যা আছে। বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়ায় কুরুচিপূর্ণ শব্দের ব্যবহার বাড়ার এরকম পরিকল্পিত লক্ষ্য বেশ স্পষ্ট। জনমত নিয়ন্ত্রণ চেষ্টার সুচিন্তিত ধরন এটা। সঠিক চিন্তাকেও ১০০ জন ক্রুদ্ধ ভাষায় আক্রমণ করলে যে কারও একপর্যায়ে ওই চিন্তার সত্যতা নিয়ে সন্দেহ জেগে উঠতে পারে। জেগে উঠছেও।
মনোবিজ্ঞানের আরও মত হলো, কথায় ও লেখায় অশ্লীল শব্দের ব্যবহার বা ওই রকম শরীরী ভঙ্গি অস্বাভাবিক আচরণজনিত সমস্যা এবং কোনো বিশেষ হতাশা ও ব্যর্থতার প্রকাশ, যা কালক্রমে হিংস্র চেহারাও নিতে পারে। অর্থাৎ আচরণজনিত সমস্যা বা পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার ধ্বংসাত্মক সমস্যার অবয়বও নেয়।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যক্তিগত সামর্থ্যের ঘাটতি নির্দেশ করে গালাগালপ্রবণতা। অর্থাৎ ব্যক্তি যখন স্বাভাবিক মানসিক শক্তি দিয়ে আর তার সামনে হাজির হওয়া নবসৃষ্ট সমস্যার মোকাবিলা করতে পারে না, তখন ওই রকম পথ নেয়। এটা মানসিক চাপের প্রকাশ, পরিত্যক্ত হয়ে পড়ার ভয়ের প্রকাশ। যা প্যারানয়েডধর্মী লক্ষণও বটে। একে বিপিডি বা বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার হিসেবেও দেখা যায়। অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা বা প্রক্রিয়ায় পাওয়া কোনো বিশেষ সুবিধা হারিয়ে ফেললেও এরকম ডিজঅর্ডার দেখা দিতে পারে।
‘বিপিডি’ পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারের অতি আলোচিত একটা শাখা। এর সঙ্গে নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার বা এনপিডিরও যোগ আছে, যা নিজেকে সবার চেয়ে সেরা ভাবানোর লক্ষণ প্রকাশ করে অন্যদের নিয়ে কুৎসা রটিয়ে।
কখনো কখনো শৈশবের সামাজিকীকরণের সমস্যা থেকেও মেজাজ হারানো বা কুরুচিপূর্ণ আচরণের আধিক্য ঘটে। সেরকম চরিত্রের শৈশবের বিশ্লেষণ থেকে এর উত্তর মিলে যায়। বাল্যকালে যারা প্রতিনিয়ত কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তার মুখে পড়েছে— প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় তারা ওই রকম বলাবলিকে স্বাভাবিক ধরে নেয়।
আবার এরকম প্রবণতা আধিপত্যবাদী মনেরও উন্মোচন হতে পারে। অনেকে ক্ষমতা জাহির করতে ও পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাসনা হিসেবে এটাকে ব্যবহার করে। লক্ষ্য থাকে অন্যকে ভীত করে তোলা, অন্যকে গুটিয়ে যেতে বাধ্য করা, অন্যকে ছোট করা, তাদের নিয়ে সমাজে সন্দেহ তৈরি, সমাজের মূলধারা থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করা, তাদের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা, ওই মতামতের শক্তি কমানো, তাদের মধ্যে অসহায়ত্বের বোধ তৈরি করে তৃপ্তি পাওয়া এবং নিজ অনুসারীদের মধ্যে নীতিগত সংকটের মুখেও সাহস জোগানো। অনুসারীদের সংঘবদ্ধ রাখা এবং কুরুচির সুনামিতে তাদেরও সহযোগী হিসেবে পাওয়া। অনেকটা হরিণশাবককে ঘিরে হায়েনার পরিমাণ বাড়ানো।
অন্যদের বাড়তি মনোযোগ পাওয়ার জন্যও নোংরামি একটা কাজের কৌশল। অমার্জিত শব্দ বেশ মনোযোগ পায় এখনকার সময়ে। চলতি ভাষায় যাকে বলে ‘ভাইরাল’ হওয়া। কুৎসা রটিয়ে ভাইরাল হতে চাওয়া নিশ্চিতভাবে এই রোগের তীব্রতম ধরন; কিন্তু মিডিয়া-মনোযোগ পাওয়ার বেশ কার্যকর উপায় এখন এটা।
গালাগাল বাড়ার পেছনে পরিবেশের প্রভাবও কাজ করে। মনোবিজ্ঞানের ক্লিনিক্যাল জরিপ বলছে উচ্চ মানসিক চাপে থাকতে হয় এমন সমাজের মানুষ বেশি গালাগাল করে। সেখানে ব্যক্তির আচরণভঙ্গি অস্বাভাবিক ও গালাগালময় হতে পারে।
ঠিক উল্টো ঘটে তুলনামূলকভাবে শান্ত, যত্নশীল ও ন্যায়পরায়ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠাদের বেলায়। বর্তমান বিশ্বে নর্ডিক অঞ্চলের দেশগুলোয় মনোবিজ্ঞানীরা গালাগালের ব্যাপকতা কম দেখেছেন।
প্রশ্ন হলো, এরকম অসুস্থতার চিকিৎসা কী? আমাদের দেশের সমস্যা হলো এসব যে অসুস্থতা সেটাই সমাজ, পরিবার বা ব্যক্তিরা সচরাচর মনে করে না। আবার যারা এটাকে গ্যাস লাইটিং কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছেন, তাদের কথাও আলাদা।
বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন দেখা যায় না— বিখ্যাত গালিবাজ বা অন্যের প্রতি কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহারকারীদের কেউ ‘রোগী’ বা অসুস্থ শনাক্ত করছে। সেটা হলে নিকটজনের দায়িত্ব পড়ত ওই ব্যক্তিকে চিকিৎসা নিতে বলা।
এরকম সমস্যার চিকিৎসক হলেন প্রাথমিকভাবে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট। সাইকোথেরাপি প্রযোজ্য তাদের জন্য। এরকম একধরনের থেরাপি হলো ডায়ালেকটিক্যাল বিহেভিয়ার থেরাপি বা ডিবিটি।
যারা সাইকোলজিতে দীর্ঘ সময় পড়েছেন, প্র্যাকটিশনার তারাই আসলে এসব বিষয়ে সঠিকভাবে বলতে সক্ষম এবং সেটা বলাটা দরকারও এখন। বাংলাদেশের তরুণসমাজ গালাগালের এমন এক সামাজিক পরিসরে পড়ে গেছে— যাকে আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না; বরং এটা আচরণগত এক গণবিপর্যয়। একালে কোনো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শুধু কুরুচিপূর্ণ আক্রমণ করে অনেকে ‘বড় নেতা’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে যাচ্ছে। তাদের পেছনে ছুটছে শত শত ক্যামেরা, রেকর্ডার। এর মধ্যে আবার অপমানজনক ভাষাকে স্বাভাবিকীকরণের চেষ্টাও আছে। এরকম ‘অসুস্থ’দের তাত্ত্বিক, পণ্ডিত, রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে মানছে লাখ লাখ অনুসারী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টক শোতে কিংবা জনসভায়ও তাদের কদর। হয়তো শ্রোতাদের পছন্দও তাই, যা উদীয়মান গণঅসুস্থতার ইংগিতবহ; কিন্তু এতে আন্তঃব্যক্তিক সুস্থ বন্ধন ধ্বংস হচ্ছে। সমাজ হিংস্র হয়ে উঠছে ক্রমেই। প্রতিশোধের চক্র তৈরি হয় এতে। এরকম সামাজিক পরিবেশকে ব্যবহার করেই ফ্যাসিবাদ পথ করে নেয়।
অস্বাভাবিক আচরণের আধিক্য ব্যক্তিগত সমস্যার পরিসর ছেড়ে বর্তমানে যেভাবে সামাজিক ব্যাধির চেহারা নিচ্ছে, তাতে অচিরে সেটাকে সফল রাজনৈতিক ঘরানা হিসেবেও দেখা যেতে পারে। হয়তো আমাদের ভবিষ্যৎ তার মাঝপথেই আছে।
লেখক: গবেষক ও বিশ্লেষক





