বিশেষায়িত বাহিনী নয় ইউনিটই থাকছে র্যাব
- ২৯ জুলাই চূড়ান্ত হতে পারে র্যাবের নতুন নাম
- পিপলস প্রটেকশন ফোর্সেস (পিপিএফ) নাম চেয়েছিল র্যাব
- আগের মতোই বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) বিরুদ্ধে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পুরনো। সেসব অভিযোগ বিবেচনায় নিয়েই বিশেষায়িত এই ইউনিটটি বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। শুরুতে কথা ছিল, র্যাব বিলুপ্ত করে নতুন একটি বিশেষায়িত বাহিনী গঠন করা হবে। কিন্তু এখন আর সেটি হচ্ছে না। আগের মতোই বিশেষায়িত ইউনিট থাকছে, তবে নামটি বদলে যাচ্ছে।
এখন পর্যন্ত আলোচনায় চারটি নাম থাকলেও নতুন নাম চূড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে আগামী ২৯ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হবে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা। সেখানেই অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে সংস্থাটির নতুন নাম চূড়ান্ত হতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই সূত্রটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নানা মহলের চাপ ও দাবি বিবেচনায় র্যাব বিলুপ্তির বিষয়ে বেশ আগেই নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছিল বিলুপ্তির পর পুলিশের একটি বিশেষায়িত বাহিনী গঠন করা হবে। র্যাবের পক্ষ থেকে নতুন নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল ‘পিপলস প্রটেকশন ফোর্সেস (পিপিএফ)’। মন্ত্রণালয় থেকেও তিনটি নাম প্রস্তাব করা হয়। এগুলো হলো— র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন ফোর্স (আরএবিএফ), স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) এবং স্পেশাল রেসপন্স ফোর্স (এসআরএফ)।
এর আগে গত ১৮ মে র্যাবের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান শেষে প্রতিষ্ঠানটি বিলুপ্তির ইঙ্গিত দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, ‘মানবাধিকারকে সমুন্নত রেখে এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করে আগামী দিনে একটি আধুনিক ও পেশাদার এলিট ফোর্স গঠনের লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার।’
জানা গেল, প্রস্তাবিত ‘পিপলস প্রটেকশন ফোর্সেস আইন-২০২৬’-এর খসড়ায় র্যাব বিলুপ্ত ও নতুন বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলা হয়েছে, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে সুসংহত করে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই এমন পদক্ষেপ। পাশাপাশি মাদকদ্রব্য, বেআইনি অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা এবং দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা সমুন্নত রাখাই মূল উদ্দেশ্য। যদিও পরে নতুন বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের অবস্থান থেকে সরে আসে সরকার। আগের মতোই বাংলাদেশ পুলিশের অধীন বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে নতুন করে প্রস্তাবিত আইনের খসড়া তৈরি করা হয়। সেই খসড়ার ওপর মতামত নিতেই হবে আগামী ২৯ জুলাইয়ের সভা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর ও সংস্থার প্রতিনিধিসহ অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে খসড়া চূড়ান্ত করা হতে পারে। সেখানেই র্যাব বিলুপ্তির পর নতুন কী নাম হবে, তা-ও চূড়ান্ত করা হবে।
প্রস্তাবিত খসড়ায় বলা হয়— এ বিশেষায়িত সংস্থাটি গঠিত হবে র্যাবের মতোই সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে। এর একজন মহাপরিচালক (ডিজি) থাকবেন, যিনি অবশ্যই পুলিশের কর্মকর্তা হবেন। তিনি পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) নিয়ন্ত্রণে থেকে সরকারের আদেশ অনুযায়ী ইউনিটের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। এ ইউনিটের কেউ অপরাধ করলে তার মূল সংস্থার সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি অনুযায়ী দণ্ডিত হবেন।
এ ইউনিটের কর্মকর্তাদের তল্লাশি, আটক ও গ্রেপ্তার করার ক্ষেত্রে থানার একজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সমান ক্ষমতা থাকবে। কোনো সদস্য কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার বা কোনো বস্তু জব্দ করলে তা যত দ্রুত সম্ভব কাছের থানায় পাঠানো এবং এ-সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন দিতে হবে। এ বিধানটি র্যাবের আইনে থাকলেও তা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না। প্রস্তাবিত আইনে এটি নিশ্চিত করতে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকবে।
যে কারণে বাতিল হচ্ছে র্যাব : মানবাধিকার ইস্যুতে গত দুই দশকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে গুম ও ক্রসফায়ারের ঘটনায়। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে, এ দুই ধরনের অপরাধেই র্যাবের নাম সবচেয়ে বেশি সামনে এসেছে। এমন বাস্তবতায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করে।
এ বছরের শুরুতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ (এইচআরডব্লিউ) বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনও সংস্থাটি বিলুপ্তির দাবি জানায়। এর আগে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় র্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। মূলত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর র্যাবের অতীতের কর্মকাণ্ড সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, মোট গুমের ঘটনার প্রায় ২৫ শতাংশের সঙ্গেই র্যাব জড়িত ছিল। একক বাহিনী হিসেবে এটা সর্বোচ্চ। গুম কমিশন যে ৪০ গোপন বন্দিশালার সন্ধান পেয়েছে, তার মধ্যে ২২-২৩টি ছিল র্যাবের। পুলিশের বিশেষ শাখার নথিতে প্রমাণ মিলেছে— গত সাত বছরে (২০১৫-২০২১ সাল) ১ হাজার ৭টি ক্রসফায়ারের ঘটনায় ১ হাজার ২৯৩ জন নিহত হয়। সেখানে দেখা গেছে, এসব ঘটনার ২৯৩টিতে র্যাবের নাম এসেছে।
ক্ষমতাসীন দল বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে র্যাবের বিলুপ্তি চেয়েছিল। এর দুই দশক আগে ২০০৪ সালের মার্চে পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ এই ইউনিটটি বিএনপি সরকারই প্রতিষ্ঠা করেছিল। এরপর র্যাবের ‘ক্রসফায়ারে’ ঢাকায় পিচ্চি হান্নানসহ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ‘চরমপন্থী সন্ত্রাসীরা’ একের পর এক নিহত হয়। তখন থেকেই আলোচনায় আসে র্যাব। আর ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনাটি তোলপাড় হয় দেশ-বিদেশে। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর নুর হোসেনের কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে র্যাব-১১-এর তৎকালীন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদসহ ১১ জন র্যাব সদস্য এ খুনের ঘটনাগুলোয় জড়িয়েছিলেন। শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর এসব ঘটনায় আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায় র্যাব। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে র্যাবে গোপন বন্দিশালা বা ‘আয়নাঘর’ থাকার কথাও স্বীকার করা হয় সংস্থাটির পক্ষ থেকে।




