এলাকার রোগীর ফি নেন না ডা. জুয়েল

চেম্বারে রোগী দেখছেন ডা. খোরশেদ আলম ভূঁইয়া জুয়েল
সপ্তাহে ছয় দিন রাজধানীর ব্যস্ত সরকারি হাসপাতালের দায়িত্ব পালন। প্রশাসনিক অনেক কাজ, রোগীর চাপ, সবকিছু সামলে শুক্রবার এলেই তিনি ছুটে যান গ্রামের বাড়ি। কারণ একটি প্রতিশ্রুতি। একজন বাবার শেষ ইচ্ছা, যা আজও অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছেন ছেলে। তিনি ডা. খোরশেদ আলম ভূঁইয়া জুয়েল।
ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট তিনি। সরকারি দায়িত্বের ব্যস্ততার মধ্যেও এক দশকের বেশি সময় ধরে প্রায় প্রতি শুক্রবার তিনি গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ পৌরসভার দত্তপাড়া মহল্লায় নিজ বাড়িতে এসে রোগী দেখেন, কিন্তু কোনো ফি নেন না। মন দিয়ে রোগীর কথা শোনেন, দেন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরামর্শ। তার হিসাব অনুযায়ী, এভাবে ছুটির দিনে এলাকায় গিয়ে এরই মধ্যে তিনি প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন।
এই মানবিক কাজের শিকড় তার পরিবারে। ডা. খোরশেদের বাবা প্রয়াত চিকিৎসক এম এ জব্বার ভূঁইয়া প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। অনেক দরিদ্র রোগীর ওষুধের টাকাও দিতেন। মৃত্যুর আগে ছেলেকে বলেছিলেন, ‘বিনা পয়সায় রোগী দেখা কখনো বন্ধ করো না।’ বাবার সেই উপদেশকেই জীবনের অঙ্গীকার হিসেবে নিয়েছেন ডা. জুয়েল।
মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তার ছাত্রজীবন থেকেই। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় ঈশ্বরগঞ্জের কোনো রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলে তার যত্ন নেওয়ার জন্য শিক্ষকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করতেন তিনি।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) তিন মাস পড়াশোনার পর জুয়েল ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। প্রকৌশলী হওয়ার সুযোগ ছেড়ে তার চিকিৎসক হওয়ার পেছনে ছিল মানুষের সেবা করার স্বপ্ন।
শুধু ঈশ্বরগঞ্জে গিয়েই নয়, ঢাকায় ‘মেডিনোভা’র মালিবাগ শাখায় তার ব্যক্তিগত চেম্বারেও ঈশ্বরগঞ্জের রোগীর রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। যেখানে সাধারণ রোগীর ফি ১ হাজার টাকা, সেখানে ঈশ্বরগঞ্জের রোগীর কাছ থেকে তিনি কখনো ফি নেন না। তার ভাষ্য, ওই চেম্বারেও এ পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার মানুষকে বিনা ফিতে চিকিৎসা দিয়েছেন।
ঈশ্বরগঞ্জ পৌরসভার বাসিন্দা আব্দুল মজিদ বলছিলেন, ‘ডা. এম এ জব্বার ভূঁইয়ার মৃত্যুর পর অনেকেই ভেবেছিলেন এলাকায় মানুষের সেবার সেই অধ্যায় বুঝি শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু তার ছেলে বাবার আদর্শকে আরও উজ্জ্বল করেছেন।’
ঈশ্বরগঞ্জ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর দত্তপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এ কে এম আজিজুর রহমান জীবনের ভাষ্য, ‘ডাক্তার জুয়েল অনেক মানবিক মানুষ। তিনি বিনা ভিজিটে রোগী দেখেন নিয়মিত। উনার কাছে অনেক রোগী যান। উনি বিনা ভিজিটে রোগী দেখার মতো মানবিক কাজ করায় আমরা গর্বিত।’
অবসরের পরের পরিকল্পনা জানতে চাইলে ডা. জুয়েল বললেন, ‘দোয়া করবেন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যেন বিনামূল্যে রোগী দেখে যেতে পারি। অবসরের পর স্থায়ীভাবে ঈশ্বরগঞ্জে থেকে মানুষের জন্য আরও বেশি সময় দিতে চাই। একদিন তো মরতেই হবে। শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরগঞ্জেই ফিরতে হবে। মানুষ যদি আমার জন্য দোয়া করে, সেটিই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’




