২৫ বছর পর জিয়া হত্যা মামলার নথির খোঁজ
- সেনা বিদ্রোহের বিচার হলেও অনিষ্পন্ন থেকে যায় ফৌজদারি আইনের মামলা
- ২০ বছরে ১৭৩ বার সময় নিয়েও চার্জশিট দিতে পারেনি সিআইডি
- দিয়েছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন, যা বিবেচিত হয় গুরুত্বপূর্ণ মামলার অপমৃত্যু হিসেবে

সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান
সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার নথির খোঁজ নেওয়া শুরু হয়েছে ২৫ বছর পর। ৪৫ বছর পালিয়ে থাকার পর গ্রেপ্তার হয়েছেন আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের একমাত্র জীবিত আসামি অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেন। তাকে সামরিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে।
নতুন এ পটভূমিতে বেসামরিক আদালতে থাকা জিয়া হত্যা মামলার গুরুত্বপূর্ণ নথিও সামনে আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মফিজুল হক ভূঁইয়া। ২০ বছর ধরে ১৭৩ বার আদালতের কাছে সময় চেয়েও অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করতে পারেনি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। দিয়েছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন, যা গুরুত্বপূর্ণ মামলার অপমৃত্যু বলেই মনে করা হয়।
চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় হওয়া জিয়া হত্যা মামলার তদন্তে ছিল সিআইডি। ১৯৮১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় নিয়েও শেষ পর্যন্ত বেসামরিক আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে বাধ্য হয় সংস্থাটি। এ রকম ক্ষেত্রে সরকারি তদন্ত সংস্থার চেয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের মনোভাব প্রাধান্য পায়। সে সময় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করায় নথিটি রেকর্ডরুমের (সংরক্ষণাগার) অন্ধকার তাকে চলে যায়।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি চট্টগ্রাম মহানগর পিপি মফিজুল হক ভূঁইয়া আগামীর সময়কে গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় বললেন, ‘একজন পলাতক আসামি গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে ঘটনাটি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। এ অবস্থায় আমরা মনে করছি মামলার নথি খুঁজে বের করা প্রয়োজন। আমি সেরেস্তা বিভাগে ডকেটটি তলব করেছি। কোতোয়ালি থানায় মামলাটি হয়েছিল। থানায়ও খোঁজ করা হবে। সিএমএম (চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট) সাহেবের সঙ্গেও দেখা করে নথিটি খুঁজে বের করার অনুরোধ জানিয়েছি।’
১৯৮১ সালের ২৯ মে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম সফরে এসেছিলেন। রাতে তিনি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে ছিলেন। ৩০ মে ভোরে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে তিনি নিহত হন। সে দলে ছিলেন সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফরও।
জিয়া হত্যায় জড়িতদের সবার সামরিক আদালতে বিচার হয়। সামরিক আদালত মৃত্যুদণ্ড দেয় ১৩ সেনা কর্মকর্তাকে। তাদের সবার ফাঁসি কার্যকর করা হয় দ্রুত।
এ ছাড়া চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় একটি নিয়মিত ফৌজদারি মামলা হয়েছিল। মামলা নম্বর ১(৬)৮১। ওই মামলার ছয় নম্বর আসামি সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেন। সেনা বিদ্রোহের বিচার হলেও অনিষ্পন্ন থেকে যায় ফৌজদারি আইনে হওয়া থানার মামলাটি।
২০ বছর নিয়মিত মামলাটির তদন্তভার বয়ে নিয়ে ২০০১ সালের ২৪ অক্টোবর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে সিআইডি। তখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার সদ্য ক্ষমতায়। তবে মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন আওয়ামী লীগের আমলে নিয়োগ পাওয়া অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন। এরপরই বিএনপি সরকারের নিয়োগ দেওয়া অ্যাডভোকেট আব্দুস সাত্তার হন মহানগর পিপি।
আইনজীবী আব্দুস সাত্তারের ভাষ্য, ‘ফখরুদ্দিন সাহেবের সময়ে সিআইডি ফাইনাল রিপোর্ট আদালতে দাখিল করে। আদালত সেটি গ্রহণ করে মামলাটি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি ঘোষণা করে। আমি এরপর দায়িত্ব নিই। আমি এসে মামলার নথিপত্র আর পাইনি। ততদিনে সেগুলো সেরেস্তায় চলে যায়।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হয় অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ফখরুদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘আমি দায়িত্ব পালনকালীন এই মামলার অগ্রগতি নিয়ে কোনো তথ্য আমার জানা নেই। তদন্তকারী সংস্থাও আমার সঙ্গে কোনো পরামর্শ করেনি। অ্যাডভোকেট সাত্তার সাহেবই এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন।’
তৎকালীন দুই পিপির বক্তব্য থেকে মামলার নথি নিয়ে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া না গেলেও আগামীর সময়ের হাতে আসা নথি থেকে জানা যাচ্ছে এ মামলার শেষ পরিণতি। ২০০১ সালের ৩ অক্টোবর চট্টগ্রামের মুখ্য মহানগর হাকিমকে পুলিশের পক্ষ থেকে একটি চিঠি দেওয়া হয়। সেই চিঠিতে ইংরেজিতে লেখা ছিল: ‘The undersigned is directed to say that the matter was discussed in the I.C.C. meeting held on 16-6-81. It has been decided that if Army authorities intimate that they have taken up the investigation of the case the Police need not proceed with it any further.’ (১৬-৬-৮১ তারিখে অনুষ্ঠিত আইসিসি সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যদি সেনা কর্তৃপক্ষ জানায় যে তারা মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করেছে, তবে পুলিশকে এ বিষয়ে আর অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজন নেই)।
এরপর সিআইডি সাক্ষী ও প্রমাণের অভাব দেখিয়ে আদালতে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। আর এর মাধ্যমে ফৌজদারি আদালতে তদন্ত ও বিচারের পুরো প্রক্রিয়ার সমাপ্তি ঘটে।




