স্ত্রীকে বলেছিলেন দেশে ফিরবেন, রাতে মৃত্যুর খবর

সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে মারা যাওয়া রাজশাহীর বাগমারার শ্যামল মাঝির বাড়িতে স্বজনদের আহাজারি। ছবি: সংগৃহীত
‘তুমার সঙ্গে হামার কালকেই কথা হলো। তুমি বাড়িত আসবে বললে, আর রাতে তুমার মরার খবর পানু’— স্বামীর শেষ কথাগুলো মনে করে বারবার বিলাপ করছেন রশিদা খাতুন (৪২)। এক সপ্তাহ পরই আট বছর সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরার কথা ছিল স্বামী শ্যামল উদ্দিন মাঝির (৪৬)। স্ত্রী-সন্তানদের কাছে ফেরার সে অপেক্ষার মধ্যেই রিয়াদের একটি কারখানায় আগুনে পুড়ে প্রাণ হারালেন তিনি।
গত রবিবার রাতে সৌদি আরবের রিয়াদের মানফুয়া এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় আগুন লাগার ঘটনায় প্রাণ হারান ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিক। তাদেরই একজন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার শ্যামল উদ্দিন মাঝি। তিনি উপজেলার ঝিকড়া ইউনিয়নের মরুগ্রাম ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। শ্যামলের মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর পর গতকাল সোমবার সকাল থেকেই তার বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। প্রতিবেশীরা এসে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও প্রিয় মানুষ হারানোর শোক সামলাতে পারছেন না রশিদা। কিছুক্ষণ পরপরই ভেঙে পড়ছেন কান্নায়। কখনো জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। স্বজনরা পানি ছিটিয়ে তাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলে জ্ঞান ফিরলেই তার মনে পড়ছে স্বামীর সঙ্গে বলা শেষ কথাগুলো। পরিবারের সদস্যরা জানালেন, রবিবার সকালেও মোবাইল ফোনে স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছিলেন শ্যামল। সে সময় জানিয়েছিলেন, আর মাত্র এক সপ্তাহ পরই ফিরবেন দেশে। দীর্ঘ আট বছর পর স্বামীকে কাছে পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন রশিদা। সন্তানরাও অপেক্ষা করছিল বাবার জন্য। কিন্তু সে কথাই যে তাদের শেষ কথা হয়ে যাবে, তা কেউ ভাবেননি।
সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে আট বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন শ্যামল। স্বজনদের কাছ থেকে টাকা ধার করে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল তাকে। পরিবারের আশা ছিল, শ্যামল উপার্জন করবেন, সংসারের অভাব ঘুচবে, নিশ্চিত হবে মেয়েদের ভবিষ্যৎ।
তবে আট বছরের প্রবাসজীবনে পরিবারের জন্য বড় কোনো সম্পদ গড়তে পারেননি তিনি। পরিবারের সদস্যদের দাবি, বাড়ির চালায় নতুন টিন দেওয়া ছাড়া তেমন কোনো পরিবর্তন আনতে পারেননি শ্যামল। নিজের প্রয়োজনের চেয়ে পরিবারকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কষ্ট করে উপার্জন করেছেন, আর সেই উপার্জনেই চলেছে সংসার। এই আট বছরে একবারও দেশে আসেননি শ্যামল। এবার দেশে ফেরার সুযোগ হয়েছিল। জমানো কিছু টাকা সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফেরার কথা ছিল তার। স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটাবেন, দীর্ঘদিন পর নিজের ঘরে ফিরবেন— এমন স্বপ্নই দেখছিলেন তিনি।




