তিস্তায় ভাঙছে গাইবান্ধার লালচামার
- সুন্দরগঞ্জে তিন শতাধিক পরিবার বসতভিটা ও শত শত বিঘা জমিহারা

যেখানে একসময় ছিল মানুষের ঘর, শিশুদের কোলাহল আর সবুজ ফসলের মাঠ, সেখানে এখন তিস্তার স্রোত। গত দুই সপ্তাহে কয়েক দফা ভাঙনে নদীতে বিলীন হয়েছে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার লালচামার গ্রামের তিন শতাধিক পরিবারের বসতভিটা ও শত শত বিঘা জমি। হারিয়েছে স্কুল, হাটবাজার ও জনপদের পরিচিত চিহ্ন; ভাঙনের মুখে রয়েছে আরও তিন শতাধিক পরিবার। নদীর বুকেই যেন হারিয়ে গেছে লালচামার গ্রামের একাংশ।
ভাঙনের সর্বশেষ শিকার চরাঞ্চলের শিশুদের একমাত্র ভরসা ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ভবনটি নদীতে চলে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জায়গাটিও হারিয়ে গেছে। অন্যদিকে, ভিটেমাটি হারানো পরিবারগুলোর কেউ আশ্রয় নিয়েছেন স্বজনের বাড়িতে, কেউ রাস্তার পাশে। আবার কেউ নদীর পাড়ে পলিথিনের ছাউনি টানিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। মাথার ওপর স্থায়ী ছাদ নেই, জমি নেই, নেই জীবিকার নিশ্চয়তা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভাঙন শুরু হওয়ার পর তারা বারবার পানি উন্নয়ন বোর্ডকে (পাউবো) বিষয়টি জানিয়েছেন। কিন্তু সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় একের পর এক বসতভিটা ও আবাদি জমি নদীতে চলে গেছে। তাদের দাবি, ভাঙনের পর সামান্য জিওব্যাগ ফেলা হলেও তাতে স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। প্রতি বছর নতুন করে ভাঙনের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের।
ভাঙনের শিকার আব্দুস সামাদ বলেছেন, ‘চোখের সামনে বসতভিটা, জমি— সব নদীতে চলে গেল। একসময় এখানে আমাদের ঘর ছিল, ফসলের মাঠ ছিল, প্রতিবেশীদের নিয়ে কত আনন্দ ছিল। এখন মাথা গোঁজার মতো জায়গাটুকুও নেই। জানি না, আগামীকাল কোথায় থাকব।’
লালচামারের এই চিত্র অবশ্য বিচ্ছিন্ন নয়। গাইবান্ধার তিস্তা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে নদীতীরবর্তী এলাকার অন্তত ১৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন অস্তিত্ব সংকটে। এর মধ্যে ফুলছড়ি, গাইবান্ধা সদর ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার আটটি বিদ্যালয় এরই মধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে। আরও ছয়টি বিদ্যালয় রয়েছে ভাঙনের ঝুঁকিতে।
বিদ্যালয় ভবন হারানোর পর এসব প্রতিষ্ঠানের আটটির পাঠদান চলছে খোলা আকাশের নিচে কিংবা অস্থায়ী ছাপরার নিচে। রোদ-বৃষ্টি ও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসছে না। এতে নদীভাঙনকবলিত শিশুদের বর্তমান শিক্ষা কার্যক্রম যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি তাদের দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাজীবনও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হারানোর প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপর। স্থানীয় স্কুল শিক্ষক সাইফুল ইসলামের ভাষায়, ‘ভাঙনে মানুষের বাড়িঘরের পাশাপাশি ভোরের পাখি স্কুলটিও নদীতে চলে গেছে। অনেক শিক্ষার্থী এখন দূরের প্রতিষ্ঠানে যেতে বাধ্য হচ্ছে। দ্রুত ভাঙন রোধ করা না গেলে এলাকার শিক্ষা কার্যক্রম বড় ধরনের সংকটে পড়বে।
গাইবান্ধা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলামের ভাষ্য, ‘ভাঙন ঠেকাতে জিওব্যাগ ফেলা হচ্ছে। পাশাপাশি ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করা হচ্ছে। নতুন করে যেসব এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে, সেসব জায়গায়ও জিওব্যাগ ফেলা হবে। তবে জরুরি কাজের জন্য বর্তমানে অন্য কোনো বরাদ্দ নেই।’



