নাইক্ষ্যংছড়ির পাহাড়ে চায়ের সবুজ স্বপ্ন

বাগানে চা পাতা তুলছেন কয়েকজন শ্রমিক। ছবি: আগামীর সময়
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের পাহাড়ে সবুজের সমারোহ। সারি সারি চা গাছ। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গড়ে উঠেছে বিশাল চা বাগান। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এই বাগানের চা যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। সম্ভাবনাময় এই চা শিল্পকে ঘিরে তৈরি হয়েছে পর্যটনেরও নতুন সম্ভাবনা।
নাইক্ষ্যংছড়ি সদর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা আশারতলী এলাকায় প্রায় ৬০ থেকে ৭০ একর পাহাড়ি জমিতে ব্যক্তি উদ্যোগে এই চা বাগান গড়ে তুলেছেন নুরুল আলম কোম্পানী। ২০১২ সালে বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু করেন তিনি। পাশাপাশি চা প্রক্রিয়াজাতের জন্য স্থাপন করেছেন একটি মিনি কারখানা।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, পাহাড়ের কোলঘেঁষে সারি সারি চা গাছ। চারপাশে ছোট-বড় উঁচু-নিচু টিলা, নানা ধরনের গাছপালা। টিলার পাশ দিয়ে আঁকাবাঁকা সড়ক। সব মিলিয়ে পুরো এলাকাটি যেন এক টুকরো সিলেট।
চা বাগানের পাশাপাশি আশপাশে গড়ে উঠেছে লেবু ও রাবারের বাগানও। ফলে কৃষিকে ঘিরে এলাকাটিতে তৈরি হচ্ছে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
বাগানের ম্যানেজার এম ডি নাসির উদ্দীন জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ একর জমিতে চা চাষ হচ্ছে। আরও কিছু জমিতে চা চাষ সম্প্রসারণের কাজ চলছে। সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন চা বাগানে প্রায় ২৩ বছর চাকরি করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
তার ভাষ্য, ‘অন্যান্য চা বাগানের তুলনায় এই বাগানের চায়ের গুণগত মান কোনো অংশে কম নয়। তবে প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ শ্রমিকের অভাবে বাগানটি কাঙ্ক্ষিতভাবে গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে না।’
বর্তমানে দৈনিক ভিত্তিতে অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ বাগানে কাজ করেন। তবে বাগানটি ঠিকমতো পরিচালনার জন্য শতাধিক অভিজ্ঞ শ্রমিক প্রয়োজন। স্থানীয় অনভিজ্ঞ শ্রমিকদের দিয়ে বর্তমানে কাজ চালানো হচ্ছে। তাদের দৈনিক ৩০০ থেকে সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা মজুরি দেওয়া হয়। চা পাতা সংগ্রহের জন্য প্রতি কেজিতে ৮ টাকা করে পারিশ্রমিক দেওয়া হচ্ছে।
এম ডি নাসির উদ্দীন জানিয়েছেন, বাগানটি নিয়মিত ও সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে বছরে ৮০ থেকে ৯০ হাজার কেজি চা উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু অভিজ্ঞ জনবলের অভাবে সেই লক্ষ্যে পৌঁছানো যাচ্ছে না। সরকারি সহযোগিতা পেলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।
বাগান মালিক নুরুল আলম কোম্পানী জানিয়েছেন, চা চাষে দীর্ঘদিন লোকসানের পর এখন কিছুটা লাভের মুখ দেখা যাচ্ছে। গত তিন বছর উৎপাদন হলেও লাভ হয়নি। বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো।
চা বোর্ডের নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। তবে এখনো অনুমোদন পাওয়া যায়নি বলেও তিনি জানান।
চা বাগানকে ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনাও এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ঈদুল আজহার পর দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যটকরা এখানে ভিড় করেছেন। প্রতি বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারও বাগানের সৌন্দর্য দেখতে পর্যটকের আনাগোনা বাড়ে।
পর্যটক আবুল কাসেম জানিয়েছেন, নাইক্ষ্যংছড়িতে চা শিল্পের বিকাশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো প্রয়োজন। শিল্পটির সঠিক উন্নয়ন হলে স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশে চা রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে কর্মহীন মানুষের কর্মসংস্থানও বাড়বে।
শিক্ষার্থী পর্যটক রোমেনা আক্তার জানিয়েছেন, নাইক্ষ্যংছড়ির যোগাযোগ ব্যবস্থা মোটামুটি উন্নত হলেও চা বাগানে যাওয়ার সড়কটি আরও উন্নত করা দরকার। শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বাগান মালিককে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হলে চা চাষ আরও সম্প্রসারিত হবে।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মাদ ইনামুল হক জানিয়েছেন, চা চাষের জন্য ওই এলাকার পরিবেশ অত্যন্ত উপযোগী। তবে বাগান মালিক সরকারি পরামর্শ বা সহযোগিতার জন্য এখন পর্যন্ত কৃষি অফিসে যোগাযোগ করেননি। এরপরও কৃষি অফিস থেকে কয়েকবার সার দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, এই বাগানে উৎপাদিত চা দিয়ে পার্শ্ববর্তী পুরো এলাকার চায়ের চাহিদা পূরণ হচ্ছে। চা শিল্পের বিকাশে উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হবে।




