কুমিল্লা
এক দশকে বেড়েছে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা

সংগৃহীত ছবি
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। জেলা জুড়ে প্রায় অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি। এর মধ্যে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ড সেই উদ্বেগকে আরও তীব্র করেছে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। পরদিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি পুলিশ এবং অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে। তদন্তে আরও কেউ জড়িত কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার, তাদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এক দশকে বেড়েছে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা
স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সাল থেকে কুমিল্লা মহানগর ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন কিশোর গ্রুপের তৎপরতা দৃশ্যমান হতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে এসব গ্রুপের বিরুদ্ধে মারামারি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক, অস্ত্র বহন, হত্যাচেষ্টা ও হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
মহানগরীর টমছমব্রিজ, সালাহউদ্দিন রোড, ঠাকুরপাড়া, বিসিক এলাকা, ধর্মপুর, রেইসকোর্স, কাঠের পুল, হাউজিং এস্টেট, দক্ষিণ চর্থা, মুরাদপুর, কাপ্তানবাজার, অশোকতলা, পার্ক রোড, মোগলটুলি, নবাববাড়ি রোড, ইপিজেড রোড, মেডিকেল কলেজ রোড, শাসনগাছা, কাটাবিল, নুরপুর, কোটবাড়ি, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, জাদুঘর রোড, সালমানপুর ও সানন্দাসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা উল্লেখ করার মতো।
এ ছাড়া মহানগরীর বাইরে চৌদ্দগ্রাম, বুড়িচং, দেবিদ্বার, মুরাদনগর, লাকসাম উপজেলায় কিশোর গ্যাং সদস্যদের বিচরণ ও নেতিবাচক কর্মকাণ্ড উল্লেখ করার মতো।
মহানগরীতে ঈগল গ্রুপ, রতন গ্রুপ বা আর স্কোয়াড, র্যাক্স, এক্স, এলআরএন, সিবিক, মডার্ন, রকস্টার, ডিস্কো বয়েজ, বস, রয়েল বেঙ্গল, সিজলিন, জে অ্যান্ড জে, বিগ ব্রাদার, টুইস্ট, ব্ল্যাক স্টার, ডার্ক, আরজিএস, সিএমসি, কিং স্কোয়াড ও ক্রাইম সেটআপসহ বিভিন্ন নামে কিশোর গ্যাং রয়েছে।
যেসব অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ
বিভিন্ন সময় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে মোটরসাইকেল ও মোবাইল চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ, মারামারি, অস্ত্র বহন, হত্যাচেষ্টা, হত্যা, নারীকে উত্ত্যক্ত করা এবং আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। এলাকায় কিশোরদের সংঘবদ্ধ মোটরসাইকেল চলাচল ও শোডাউন নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সংঘবদ্ধ অবস্থায় তারা বিভিন্ন এলাকায় ভয়ভীতি সৃষ্টি এবং আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে। স্থানীয়দের কেউ কেউ এসব অপরাধে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগও করেছেন।
একের পর এক হত্যাকাণ্ড
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা বিভিন্ন ঘটনায় গত কয়েক বছরে একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ২০১৬ সাল থেকে চলতি বছরের ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ‘অন্তত ১৪টি হত্যাকাণ্ড’ কিশোর গ্যাং দ্বারা সংঘটিত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করে। এর মধ্যে ২০২২ সালের ১৯ আগস্ট কুমিল্লা নগর উদ্যানের সামনে দুই কিশোর গ্রুপের বিরোধের জেরে মো. শাহাদাত হোসেন (১৫) নামে এক কিশোরকে কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ ওঠে। একই বছরের ৩১ ডিসেম্বর নগরীর দক্ষিণ চর্থার বড়পুকুর পাড় এলাকায় থার্টি ফার্স্ট নাইটের একটি অনুষ্ঠান থেকে ডেকে নিয়ে ফয়সাল ইসলাম হৃদয় (১৮) নামে এক কিশোরকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনা ঘটে।
২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর নগরীর অশোকতলা এলাকায় সজীব হোসেন ওরফে বাবু (২২) নামে এক যুবককে মারধর ও ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনাতেও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। চলতি বছরের ১০ জুন চৌদ্দগ্রামের চিওড়া ইউনিয়নের ধোড়করা বাজারে দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় হৃদয় (১৯) নামে এক সিএনজিচালক ছুরিকাঘাতে নিহত হন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে নতুন করে আতঙ্ক
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লার কোটবাড়ি, লালমাই পাহাড় ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যায়। পরে সেখানে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যের কথা উঠে এসেছে।
তবে স্থানীয়রা মনে করেন, কিশোর গ্যাং মোকাবিলায় শুধু গ্রেপ্তার বা অভিযান যথেষ্ট নয়। পরিবারে নজরদারি, স্কুল-কলেজে কাউন্সেলিং, মাদক নিয়ন্ত্রণ, কিশোরদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পুলিশের নজরদারি বৃদ্ধি এবং অপরাধে প্রাপ্তবয়স্ক পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা, সবগুলো বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে কিশোরদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে তাদের বয়স, অপরাধের ধরন এবং আইনি অধিকার বিবেচনা করাও জরুরি।
মানবাধিকারকর্মী ফারহা এমদা ইম্পা কিশোর গ্য্যাংয়ের উৎপাতকে আশঙ্কাজনক উল্লেখ করে জানান, কিশোর গ্যাং একটা সংগঠন, যারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের দ্বারা নেতিবাচকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তাই কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যেমন সক্রিয়তা প্রয়োজন, তেমনি এর পাশাপাশি অভিভাবকদের সর্বোচ্চ সচেতন হতে হবে, আপনার সন্তান কার সঙ্গে চলাফেরা করছে, বাইরে কী করছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার কর্মকাণ্ড কী- এগুলো নজরদারি করতে হবে।
তা ছাড়া রাজনীতিবিদের উচিত এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের নিজেদের দলে না ভেড়ানো। তারা গ্রেপ্তার হলে তাদের ছাড়ানোর জন্য কোনো প্রকার তদবির না করা।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর কাজী গোলাম কিবরিয়া জানান, কিশোর গ্যাং ও মাদকের প্রবণতা একই ধরনের অপরাধ। ক্ষমতাসীনরা সবসময় কিশোর গ্যাংকে প্রশ্রয় দেয়। যদি ক্ষমতাসীনরা মনে করে কিশোর গ্যাংকে তারা প্রশ্রয় দেবে না, তাহলে দেখবেন কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব থাকবে না।
কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মাহমুদ ওয়াসিম জানান, বর্তমান ক্ষমতাসীন কোনো রাজনীতিবিদ কিশোর গ্যাংকে প্রশ্রয় দেয় না। কিশোর গ্যাং এখনো ছাত্রলীগের নেতৃত্বে চলছে। এটা নির্মূল করতে হলে পুলিশ প্রশাসনকে সক্রিয় হতে হবে।
পুলিশি অভিযান অব্যাহত থাকলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না
কুমিল্লায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন সময়ে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের আটক ও গ্রেপ্তার করছে। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযান ও গ্রেপ্তারের পরও অনেক এলাকায় একই ধরনের অপরাধ চলমান রয়েছে।
জেলা পুলিশের সূত্র মতে, গত ১৫ দিনে প্রায় পাঁচ শতাধিক কিশোর গ্যাং সদস্যকে আটক করেছে জেলা পুলিশ।
কুমিল্লা পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানান, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। গত ১৫ দিনে জেলা জুড়ে অভিযান চালিয়ে অন্তত পাঁচ শতাধিক কিশোর গ্যাং সদস্যকে আদালতে পাঠিয়েছি। কিশোর গ্যাং দমনে জেলা পুলিশ সক্রিয়।





