শাহনাজের হাত ধরে স্বাবলম্বী ৭০০ নারী

নিজ বাড়িতে নারী কর্মীদের নিয়ে হস্তশিল্পের কাজ করছেন শাহনাজ
অভাব-দারিদ্র্যের মধ্যে টিকে থাকার লড়াইয়ে সুঁই আর কয়েক গুছি সুতাকে সম্বল করে জীবিকার কঠিন লড়াইয়ে নেমেছিলেন পাবনার চাটমোহর উপজেলার প্রত্যন্ত জবেরপুর গ্রামের নারী শাহনাজ পারভীন। জীবন-সংগ্রামের সেই সামান্য শুরুটাই আজ দেড় দশকের ব্যবধানে রূপ নিয়েছে বিশাল বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কে। তবে শাহনাজের এই পথচলা শুধু তার নিজের ভাগ্যোন্নয়ন বা অর্থনৈতিক অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তার হাত ধরে বদলে গেছে চাটমোহরের কয়েকটি গ্রামীণ জনপদের সামাজিক চিত্র। রক্ষণশীলতার শিকল ভেঙে এবং দারিদ্র্যের অভিশাপ কাটিয়ে তিনি স্বাবলম্বী করে তুলেছেন এলাকার অন্তত ৭০০ নারীকে, যারা অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি পেয়েছেন পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদা। শাহনাজের (৪০) সংগ্রামী যাত্রার শুরু ২০১১ সালে। স্বামী আনসার আলীর ক্ষুদ্র মুদিদোকানের স্বল্প আয়ে যখন সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল, তখন তিনি স্বল্পপরিসরে হস্তশিল্পের কাজ শুরু করেন।
শাহনাজ বলছিলেন, ‘আমি প্রথমে মাত্র সাতটি শাড়িতে হাতের কাজ দিয়ে শুরু করেছিলাম। এখন মেয়েদের তৈরি পোশাকে জরি, চুমকি কারচুপির কাজ করি। শুরুর দিকে কাজ পাওয়া খুব সহজ ছিল না; কিন্তু আমি দমে যাইনি। ধীরে ধীরে কাজের মান দেখে মানুষ আস্থা রাখতে শুরু করে। বর্তমানে দেশের পাঁচটি বড় কারখানা আমার কাছ থেকে পোশাক কিনে নেয়। এখন আমার অধীনে প্রায় ৭০০ নারী নিয়মিত কাজ করছেন। সুঁই-সুতাসহ সব সামগ্রী আমি সরবরাহ করি। দক্ষতাভেদে একজন নারী এখানে হস্তশিল্পের কাজ করে মাসে ৬ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করছেন।’
শাহনাজ জানিয়েছেন, আগে অভাবের কারণে পরিবারগুলোতে অশান্তি লেগে থাকত। কিন্তু এখন নারীরা ঘরে বসে উপার্জন করে সংসারে সহায়তা করছেন, ফলে পরিবারগুলোয় শান্তি এসেছে এবং সবাই বেশ ভালো আছেন। নিজের পাশাপাশি এলাকার অসহায় নারীদের জন্য কিছু করতে পারছি, এতেই আমি খুশি।
শাহনাজের স্বামী আনসার আলীও এখন স্ত্রীর সহযোগী। গর্বভরে নিজেকে স্ত্রীর প্রতিষ্ঠানের কর্মী পরিচয় দিয়ে তিনি বললেন, ‘আমার স্ত্রী প্রথমে ৭-১০টি শাড়ি নিয়ে কাজ শুরু করেছিল। একপর্যায়ে মহাজন বিল না দেওয়ায় সে নিজের গয়না বিক্রি করে কর্মীদের বিল শোধ করে। কিন্তু হাল না ছেড়ে নতুন জায়গায় কাজ শুরু করে। ধীরে ধীরে ব্যবসার পরিধি বাড়লে আমি নিজের দোকান ছেড়ে দিয়ে পুরোদমে তার সঙ্গে কাজে যুক্ত হই।’ পল্লী কর্মসংস্থান ফাউন্ডেশনের সহায়তায় ২০১৯ সালে বেসরকারি সংস্থা ‘পাবনা প্রতিশ্রুতি’ থেকে ৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে শাহনাজ ব্যবসায় গতি আনেন।
শাহনাজ যোগ করলেন, ‘আগে অভাবের কারণে পরিবারগুলোয় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি লেগে থাকত। কিন্তু এখন নারীরা ঘরে বসে উপার্জন করে সংসারে সহায়তা করছেন, ফলে পরিবারগুলোয় শান্তি এসেছে এবং সবাই বেশ ভালো আছেন।’ শাহনাজের কুটিরশিল্পের কর্মী শুকজান বলছিলেন, ‘একটা মেয়ে যেন অন্যের ওপর নির্ভর না করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, নিজের সন্তানকে মানুষ করতে পারে এবং স্বামী ওপর নির্ভরশীল হতে না হয়— আমরা এখন সে চেষ্টাই করছি।’
আরেক কর্মী মৌসুমীর ভাষ্য, ‘আগে আমাদের গ্রামে দরিদ্র পরিবারে মেয়েদের খরচ চালাতে না পেরে মা-বাবারা কম বয়সেই বিয়ে দিয়ে দিতেন। এখন এ কাজ করে মেয়েরা নিজেদের পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছে এবং মা-বাবার কষ্ট কমেছে।’
স্থানীয় সমাজকর্মী খোন্দকার খালেদ হোসেন বললেন, ‘চাটমোহর একসময় আত্মহত্যাপ্রবণ এলাকা ছিল। পারিবারিক কলহে প্রতি বছর অনেক নারী আত্মহত্যা করতেন। এখন সে পরিস্থিতি বদলেছে। এলাকার নারীদের ভাগ্য পরিবর্তনে দৃষ্টান্ত গড়েছেন শাহনাজ।
সংশোধনী
গতকাল ২৩ সেপ্টেম্বর প্রথম পৃষ্ঠায় ‘ধন্যবাদ’ অংশে পর্যটন ব্যবসায়ী কে এম বাচ্চুর বাড়ি কক্সবাজার উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তার বাড়ি পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটায়। অসাবধানতাবশত এ ভুলের জন্য আমরা দুঃখিত। বা. স.



