কাঁধে ঋণের বোঝা মনে দস্যুর ভয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘গত মৌসুমে দস্যুদের ৩ লাখ টাকা চাঁদা দিয়েছি, লোকসান হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ, আগের ঋণও রয়ে গেছে ১৫ লাখ। তারপরও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এবার ৪০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে সাগরে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এবারও লোকসান হলে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে যাবে’— বলছিলেন বাগেরহাটের দুবলারচরের শুঁটকি ব্যবসায়ী মো. জাকির শেখ।
তার মতো অনেক জেলে-মহাজন গত মৌসুমের লোকসান ও ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে নতুন করে সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ৩০ অক্টোবর থেকে পূর্ব সুন্দরবনের দুবলারচরে শুরু হচ্ছে পাঁচ মাসের শুঁটকি আহরণ মৌসুম। কিন্তু নতুন মৌসুমের আগে তাদের স্বস্তি নেই। গতবার দস্যুদের চাঁদাবাজি, জেলে অপহরণ, মুক্তিপণ ও বৈরী আবহাওয়ায় লোকসানের বোঝা এখনো কাটেনি। আগের ঋণ শোধ করতে না পেরে অনেকে আবার চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সাগরে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের আশঙ্কা, এবারও নিরাপদে মাছ ধরতে না পারলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
প্রায় ১০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই শুঁটকি ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো মানুষের জীবিকা। মৌসুম সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে জেলে ও বহদ্দাররা (মহাজন) দুবলারচরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন। বন বিভাগের অনুমতিপত্র নিয়ে আজ থেকে তাদের যাত্রা করার কথা।
রামপালের এনামুল হক গত মৌসুমে ৩ লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে ২০ লাখ টাকা লোকসান করেছেন। আগের ১০ লাখ দেনার সঙ্গে এবার নতুন করে ৪০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। একই এলাকার জিয়া শেখের লোকসান ৩০ লাখ; আগের দেনা ২০ লাখ টাকা। এবার তিনি ঋণ নিয়েছেন ৪৫ লাখ টাকা।
দুবলারচরের শুঁটকি ব্যবসায়ীরা সাধারণত পাঁচ মাসের মৌসুম পরিচালনা করতে বিভিন্ন সমিতি ও মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নেন। ওই টাকা দিয়ে নৌকা ও ট্রলারের খরচ, জেলেদের মজুরি, জ্বালানি, খাবার, জাল এবং শুঁটকি তৈরির সরঞ্জাম কেনা হয়। মৌসুম শেষে মাছ ও শুঁটকি বিক্রির আয় থেকে ঋণের আসল ও লাভের অংশ পরিশোধ করেন তারা। কিন্তু দু-তিন বছর ধরে দস্যুতা, চাঁদাবাজি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে এই হিসাব মিলছে না।
দুবলারচর ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কামাল উদ্দিন আহমেদের ভাষ্য, দুবলারচরের শুঁটকির সুনাম রয়েছে দেশ-বিদেশে। কিন্তু দস্যুদের তৎপরতায় এ ব্যবসা এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মৌসুম ঘিরে নতুন নতুন দস্যু বাহিনী সংগঠিত হওয়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। দস্যুতা বন্ধে মৌসুমের শুরু থেকেই কঠোর অভিযান চালানোর জন্য জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, বন বিভাগ ও কোস্ট গার্ডের সঙ্গে কথা বলেছেন তারা।
মৎস্যজীবীদের নিরাপত্তায় কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন বিশেষ ব্যবস্থা নেবে জানিয়েছেন কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন। তার ভাষায়, দুবলারচর, আলোরকোল, কটকা ও আশপাশের নদী-চ্যানেলে কোস্ট গার্ডের জাহাজ, বোট ও বিশেষ টহল দল নিয়মিত টহল দেবে। চাঁদাবাজি ও অপহরণ প্রতিরোধে নজরদারি বাড়ানো হবে। নিরাপত্তাজনিত সমস্যা বা দস্যুতার ঘটনায় দ্রুত সহায়তা পেতে কোস্ট গার্ডের জরুরি সেবা নম্বর ১৬১১১-এ যোগাযোগের অনুরোধও জানিয়েছেন তিনি।
বন বিভাগের তথ্য বলছে, দেশের মোট শুঁটকি উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে দুবলারচরকেন্দ্রিক শুঁটকি পল্লীগুলো থেকে। সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের আওতায় মাঝের কিল্লা, আলোরকোল, নারকেলবাড়িয়া ও শ্যালারচরে প্রতি বছর শীত মৌসুমে সামুদ্রিক মাছ আহরণ ও শুঁটকি তৈরির কাজ চলে। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বাগেরহাট, পিরোজপুর, খুলনা, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে জেলে ও বহদ্দাররা সেখানে অস্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরিফুল ইসলামের ভাষ্য, গত মৌসুমে বৈরী আবহাওয়া ও দস্যুদের কারণে জেলেরা নিয়মিত মাছ ধরতে পারেননি। এতে শুঁটকি উৎপাদন ও রাজস্ব আয় দুই ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুবলার চরের চারটি শুঁটকি পল্লী থেকে ৮ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। তবে উৎপাদন হয় ৫ হাজার ৪৩১ দশমিক ৭ টন শুঁটকি আর রাজস্ব আয় হয় ৭ কোটি ৩৭ লাখ ২২ হাজার ৪৯৩ টাকা। চলতি মৌসুমে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৭ কোটি টাকা।




