সিজারের পর শত নারীর যক্ষ্মা, কারণ খুঁজছে আইইডিসিআর

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড ক্লিনিক। গত ২২ ফেব্রুয়ারি সেখানে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেন চর হোগলা গ্রামের আবু কালাম মালের মেয়ে সুমাইয়া আক্তার (১৯)। এরপর ২৭ ফেব্রুয়ারি বাড়ি ফেরেন তারা। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করলেও দেখা গেল দুই সপ্তাহ পরও সুমাইয়ার অস্ত্রোপচারের ক্ষতস্থান শুকায়নি। ফের তাকে নেওয়া হয় ক্লিনিকটিতে। সেখান থেকে ড্রেসিং করে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এর এক মাস পর ক্ষতস্থান দিয়ে রক্ত বের হলে সন্দেহ হয় পরিবারের সদস্যদের। তারা শরীয়তপুরের আরেকটি বেসরকারি হাসপাতালে সুমাইয়ার পরীক্ষা করান। সেখানে তার যক্ষ্মা ধরা পড়ে।
প্রায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে ৩০ বছর বয়সী শাহনাজ পারভীনের সঙ্গেও। সিজারের পর ক্ষতস্থান না শুকানো এবং তার জের ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যক্ষ্মা ধরা পড়া। শুধু সুমাইয়া বা শাহনাজ নয়, ভেদরগঞ্জ ও আশপাশের এলাকার শতাধিক নারীর শরীরে যক্ষ্মার সংক্রমণ ধরা পড়েছে ওই ক্লিনিকটিতে সিজারিয়ান অপারেশনের পর। যার মধ্যে অন্তত ৫৩ জন ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন। অন্যরা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
এ ঘটনার তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে জেলা সিভিল সার্জন ও উপজেলা স্বাস্থ্য দপ্তরে অন্তত ১০টি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২০ জুন সংক্রমণের কারণ অনুসন্ধানে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) ওই ক্লিনিক থেকে বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে গেছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর সংক্রমণের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে— বললেন স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা।
ভেদরগঞ্জ উপজেলায় প্রায় চার লাখ মানুষের বাস। যার বিপরীতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যাসংখ্যা মাত্র ৫০টি। বিপুলসংখ্যক মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে কর্তৃপক্ষকে প্রায়ই হিমশিম খেতে হয়। আর এ সুযোগেই উপজেলা সদরে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতাল। প্রশ্ন রয়েছে যেগুলোর অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে। তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড ক্লিনিক। যেখানে গত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ৪০০টি সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে। যার মধ্যে শতাধিক নারী হয়েছেন যক্ষ্মা সংক্রমণের শিকার।
অভিযোগের বিষয়ে গতকাল রবিবার কথা হয় মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড ক্লিনিকের ম্যানেজার নুর ইসলামের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘আপাতত আমাদের অস্ত্রোপচারের কক্ষ বন্ধ রাখা হয়েছে। আইইডিসিআরের কর্মকর্তারা বিভিন্ন তথ্য ও নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে গেছেন। প্রতিবেদন হাতে পেলে জানা যাবে, কী কারণে রোগীদের মধ্যে যক্ষ্মার সংক্রমণ হয়েছে।’
৩১ মার্চ থেকে ক্লিনিকটির অস্ত্রোপচারের কক্ষ বন্ধ রাখা হয়েছে বলে নিশ্চিত করলেন ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবু নাঈম মো. ইফতেখারুল ইসলাম। আক্রান্তদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে এ কর্মকর্তা বললেন, ‘সংক্রমণের কারণ অনুসন্ধানে আইইডিসিআর অটোক্লেভ যন্ত্র, কর্মী, দেয়ালসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে গেছে। প্রাথমিকভাবে ক্লিনিকটির কিছু যন্ত্রপাতিতে যক্ষ্মার জীবাণুর নমুনা পাওয়া গেছে।’ জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. রেহান উদ্দিনও জানালেন তদন্ত চলার কথা। প্রতিবেদন হাতে পেলেই যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দিলেন তিনি।
অন্যদিকে, যক্ষ্মা আক্রান্ত হওয়ায় ভুক্তভোগীদের শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি বেড়েছে চিকিৎসাব্যয়। সিজারিয়ান অপারেশন, সন্তান জন্মদানের পরপরই নতুন করে আক্রান্ত হওয়ায় বিপাকে পড়েছে পরিবারগুলো।
ভুক্তভোগী সুমাইয়ার বাবা আবু কালাম মাল আগামীর সময়কে বলছিলেন, ধারাবাহিক সংকটের কথা। তিনি বললেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, তাই এখন ভেদরগঞ্জ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাচ্ছি। আমার মেয়ে এখনো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারে না। রোগ ভালো হবে কি না, তা নিয়ে সে দুশ্চিন্তায় থাকে। গত মে মাসে জেলা সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছি। আমি এর সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার চাই।’
শাহনাজ পারভীন জানালেন, তার এখনো ব্যথার কারণে হাঁটতে সমস্যা হওয়ার কথা। এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের দাবিও করলেন তিনি। রানী বেগম (২৫) নামে আরেক ভুক্তভোগী বললেন, ‘ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর বর্তমানে গ্রামে আছি। আমার মতো আর কেউ যেন এভাবে আক্রান্ত না হয়। আমি এখন স্বাভাবিকভাবে কোনো কাজ করতে পারি না, সন্তানদেরও ঠিকমতো যত্ন নিতে পারি না। অন্যের সাহায্য নিয়ে চলাফেরা করতে হয়। এ ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিচার চাই।’





