লাল মাটিতে আনারসের পাশে জায়গা করে নিচ্ছে কাজুবাদাম

ছবি: আগামীর সময়
টাঙ্গাইলের মধুপুরের লাল মাটির পরিচিত ফসল আনারস। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হচ্ছে কাজুবাদাম। পাহাড়ি উঁচু জমি, অনুকূল জলবায়ু ও লাল মাটির কারণে ভালো ফলন পাচ্ছেন কৃষকরা। তাই এ অর্থকরী ফসল ঘিরে মধুপুরে তৈরি হয়েছে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।
একই সঙ্গে কৃষি বিভাগ তথ্য ও প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে পাহাড়ি এলাকাগুলোতে কাজুবাদাম চাষ সম্প্রসারণে কাজ করছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গাছে ফল আসতে শুরু করে চারা রোপণের প্রায় দুই বছর পর থেকেই। রোপণের সময় গর্তে গোবরসহ প্রয়োগ করা হয় প্রয়োজনীয় সার। প্রাথমিক পর্যায়ে নিয়মিত সেচ দিতে হয় গাছের গোড়ায়। ফল ধরার সময়ও পরিচর্যা ও সারের সঠিক ব্যবহারে বাড়ে ভালো ফলনের সম্ভাবনা। পরামর্শ দেওয়া হয় প্রতিটি চারা ৭ থেকে ৮ মিটার দূরত্বে রোপণের।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, সবুজ পাতার ফাঁকে ফুটে থাকা গোলাপি ফুল ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে কাজুবাদামে। দৃষ্টিনন্দন এ দৃশ্য স্থানীয়দের পাশাপাশি আকর্ষণ করছে দর্শনার্থীদেরও। ফলে কৃষকদের সঙ্গে বেড়েছে আগ্রহী দর্শনার্থীদের আনাগোনাও।
কৃষি অধিদপ্তর জানিয়েছে, মধুপুর গড়াঞ্চলের লাল ও অম্লীয় মাটি, উঁচু পাহাড়ি জমি এবং অনুকূল আবহাওয়া কাজুবাদাম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এ মাটিতে আয়রন ও অ্যালুমিনিয়ামের উপস্থিতি গাছের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। আবার পাহাড়ি উঁচু জমিতে পানি জমে না, যা কাজুবাদাম চাষের অন্যতম প্রধান শর্ত।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে মধুপুরে কাজুবাদাম স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। বর্তমানে এ অঞ্চলে আনারস, কলা, পেঁপে, আদাসহ মিশ্র চাষ হচ্ছে বিভিন্ন ফসলের। একইভাবে কাজুবাদামও অন্যান্য ফলের সঙ্গে একই জমিতে চাষ করা সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।
স্থানীয় কৃষক হানিফ জানিয়েছেন, কৃষি বিভাগের সহায়তায় চারা সংগ্রহ করে তিনি কাজুবাদাম চাষ শুরু করেন। মাত্র দুই বছরের মধ্যে গাছে আশানুরূপ ফল এসেছে। তার আশা, এটি একটি লাভজনক অর্থকরী ফসলে পরিণত হবে। তার সাফল্য দেখে এলাকার অনেক কৃষক কাজুবাদাম চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
তার মতে, এ অঞ্চলের অন্যান্য ফলের তুলনায় কাজুবাদাম বেশি লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং ভবিষ্যতে আনারসের পর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল হিসেবে স্থান করে নিতে পারে।
আরেক কৃষক লিটন মিয়া জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি মধুপুরের লাল মাটিতে আনারস চাষ করছেন। এখন কাজুবাদামের মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনা দেখছেন।
তার ভাষ্য, ‘লাল মাটির খনিজ উপাদান, উঁচু জমির ভালো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং অনুকূল জলবায়ু কাজুবাদাম চাষের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে।’
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, কাজুবাদাম একটি উচ্চমূল্যের ফসল, যার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। মধুপুরের লাল মাটি এ চাষের জন্য উপযোগী। একবার চারা রোপণ করলে ৩৫ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কাজুবাদাম আমদানি করতে হয়। মধুপুরসহ দেশের পাহাড়ি এলাকায় কাজুবাদাম চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
কৃষি গবেষণা বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আশিকুর রহমান আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, টাঙ্গাইলের পাহাড়ি এলাকাগুলোকে কাজুবাদাম চাষের আওতায় আনতে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। মধুপুরের কৃষকদের নিয়মিত তথ্য ও প্রযুক্তিগত সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, পাহাড়ি লাল মাটিতে পানি জমে না বলে এ অঞ্চল কাজুবাদাম চাষের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। পাশাপাশি এ অঞ্চলে প্রচলিত মিশ্র চাষ পদ্ধতির সঙ্গে কাজুবাদাম যুক্ত করে কৃষকরা একই জমিতে একাধিক লাভজনক ফসল উৎপাদন করতে পারবেন।





