বরগুনায় সচলের আগেই অচল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বরগুনার বেতাগী পৌরসভায় নিরাপদ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছিল আধুনিক পানি শোধনাগার। কথা ছিল নদীর পানি শোধন করে পৌঁছে দেওয়া হবে পৌরবাসীর ঘরে ঘরে। কিন্তু উদ্বোধন তো দূরের কথা, নিয়মিত পানি সরবরাহ শুরুর আগেই অচল হয়ে পড়েছে পুরো প্ল্যান্ট। এক বছর আগে পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের পরও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, সঞ্চালন পাইপলাইনে ত্রুটি আর পরিচালন ব্যবস্থার অভাবে পড়ে আছে কোটি টাকার এই প্রকল্প। ফলে নিরাপদ পানির সংকট দূর হওয়ার বদলে প্ল্যান্টটি এখন পরিণত হয়েছে অব্যবহৃত অবকাঠামোয়।
শুধু যন্ত্রপাতি অচলই নয়, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় প্ল্যান্টের বিভিন্ন অংশে দেখা দিয়েছে অযত্নের ছাপ। প্রশাসনিক ভবন, ফিল্টারিং ইউনিট, কেমিক্যাল হাউজ ও পানি সংরক্ষণাগারসহ পুরো অবকাঠামো নির্মিত হলেও প্রিসেডিমেন্টেশন ট্যাংক ও ওয়াটার রিজার্ভারে জমেছে শ্যাওলা, আবর্জনা ও কচুরিপানা। সেখান থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। রাসায়নিক মিশ্রণ ও পরিশোধনের চেম্বারে জমেছে ধুলোবালি। পাম্প, ব্যাকওয়াশ ইউনিট, ফিল্টার বেড ও পাইপলাইনের বিভিন্ন অংশেও ধরতে শুরু করেছে মরিচা।
প্ল্যান্টের তত্ত্বাবধায়ক খোকন তালুকদার জানিয়েছেন, কাজ শেষ হওয়ার পর কয়েকবার পরীক্ষামূলকভাবে প্ল্যান্ট চালু করা হয়েছিল। তখন পানির চাপে বিভিন্ন স্থানে পাইপ ফেটে যায়। পরে বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের কারণে বিচ্ছিন্ন করা হয় সংযোগ। বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ থাকায় পুরো প্ল্যান্ট অচল। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় যন্ত্রপাতিও নষ্ট হচ্ছে।
প্রকল্পের তথ্য বলছে, কার্যাদেশ অনুযায়ী নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ১৮ মাসের মধ্যে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের প্রায় তিন বছর পর ২০২৫ সালের ১৫ জুন এটি পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। হস্তান্তরের আগে পরীক্ষামূলকভাবে পানি সরবরাহ করতে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে প্রধান সঞ্চালন লাইন ফেটে যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পানির চাপ সামলানোর মতো সক্ষমতা পাইপলাইনের নেই। নিম্নমানের পাইপ ও ফিটিংস ব্যবহারের কারণেই সংযোগস্থলগুলো ভেঙে পড়েছে।
উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. মহসীন খান মনে করেন, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতা, নিম্নমানের কাজ ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের কারণে সরকারের প্রায় ৫ কোটি টাকার প্রকল্পটি এখন ধ্বংসের পথে। তার মতে, নিরপেক্ষ তদন্ত করে অনিয়মের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা এবং দ্রুত সঞ্চালন লাইনের ত্রুটি মেরামত করে পানি সরবরাহ চালু করা দরকার।
তবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বেতাগী উপজেলা প্রকৌশলী সজল চন্দ্র সিকদারের দাবি, নির্ধারিত নকশা ও গুণগত মান বজায় রেখেই শেষ করা হয়েছে প্রকল্পের কাজ। ২০২৫ সালের ১৫ জুন পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে তা হস্তান্তর করা হয়। এরপর প্ল্যান্ট পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের দায়িত্ব পৌরসভার। পরীক্ষামূলক চালুর সময় পাইপলাইনে যে ত্রুটি দেখা দিয়েছিল, তা মেরামত করে দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় ও দক্ষ জনবল না থাকায় পৌরসভা প্ল্যান্টটি পরিচালনা করতে পারছে না।
এদিকে বেতাগী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জসিম উদ্দিনের মতে, প্রকল্পটির কাজ নিম্নমানের এবং শিডিউলেও বড় ধরনের গলদ ছিল। তার দাবি, পৌরসভার পক্ষ থেকে একাধিকবার অভিযোগ করা হলেও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর জোড়াতালি দিয়ে প্রকল্পটি হস্তান্তর করেছে।
জনস্বার্থে নির্মিত প্রকল্প দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা দুঃখজনক— বলছেন পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহ. সাদ্দাম হোসেন। তিনি জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে পৌরসভা ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে।





