‘লিবলুহুং’, কচ্ছপের মাথার পাহাড়ে রোমাঞ্চের ডাক

ছবি: আগামীর সময়
সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে সরু পথ। কোথাও ঘন বাঁশবন, কোথাও পাথুরে ঝিরি; আবার কোথাও দুপাশে গভীর খাদ। সভ্যতার কোলাহল পেছনে ফেলে যতই এগিয়ে যাওয়া যায়, ততই বদলে যায় প্রকৃতির রূপ। এমনই এক দুর্গম ও বুনো সৌন্দর্যের আধার বান্দরবানের আলীকদমের লিবলুহুং পর্বত।
চিম্বুক রেঞ্জের গভীর পাহাড়ি অরণ্যে অবস্থিত এ পর্বতের উচ্চতা আনুমানিক ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ ফুট। দুর্গম ট্রেইল, ঘন অরণ্য, পাহাড়ি ঝিরি আর চূড়ার দিগন্তজোড়া দৃশ্যের কারণে অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় ট্রেকারদের কাছে লিবলুহুং ধীরে ধীরে আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠছে।
স্থানীয় ম্রো ভাষায় ‘লিবলু’ অর্থ কচ্ছপের মাথা এবং ‘হুং’ অর্থ পাহাড়। দূর থেকে পাহাড়টির চূড়ার আকৃতি অনেকটা মাথা উঁচু করে থাকা কচ্ছপের মতো মনে হয়। সেই ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য থেকেই নাম হয়েছে লিবলুহুং।
লিবলুহুংয়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর চূড়ার দৃশ্য। ওপরে উঠলে চারদিকে দেখা যায় পাহাড়ের পর পাহাড়। মদক ও মিরঞ্জা রেঞ্জের সবুজ পাহাড়ের ঢেউ যেন দিগন্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। মেঘ, বাতাস আর নীরব অরণ্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর ট্রেকিংয়ের কষ্ট অনেকটাই ভুলিয়ে দেয়।
তবে লিবলুহুং কোনো সহজ পর্যটনকেন্দ্র নয়। ট্রেইলের বড় অংশজুড়ে রয়েছে খাড়া উত্থান-পতন, পিচ্ছিল পাথর, সরু পাহাড়ি রিজ, ঝিরি ও ছোট-বড় জলধারা। ঘন বাঁশবন ও বন্য গাছগাছালির ভেতর দিয়ে এগিয়ে যেতে হয় অনেকটা পথ। বর্ষায় জোঁক, আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও পিচ্ছিলতার কারণে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
পথে দেখা মেলে ম্রোসহ স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পাড়া, জুমচাষ ও পাহাড়ি জীবনযাত্রার নানা চিত্র। কোথাও জুমঘর, কোথাও পাহাড়ি মানুষের সরল আতিথেয়তা—দুর্গম এই অভিযানে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা।
যেতে হলে প্রস্তুতি জরুরি
লিবলুহুং অভিযানে অভিজ্ঞ স্থানীয় গাইড সঙ্গে রাখা জরুরি। সীমান্তঘেঁষা ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যাওয়ার আগে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের বর্তমান নির্দেশনা জেনে নেওয়া উচিত। দলছুট হওয়া কিংবা অপরিচিত পথে একা এগিয়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
ট্রেকিংয়ের জন্য গ্রিপযুক্ত জুতা, দ্রুত শুকায় এমন পোশাক, রেইনকোট বা পনচো, অতিরিক্ত মোজা, হেডল্যাম্প, পাওয়ার ব্যাংক, ফার্স্ট এইড কিট, ওআরএস, পর্যাপ্ত পানি, শুকনো খাবার ও জোঁক প্রতিরোধের প্রয়োজনীয় উপকরণ সঙ্গে রাখা দরকার। মোবাইল নেটওয়ার্ক ও চিকিৎসাসুবিধা সীমিত থাকায় প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
সম্ভাব্য ট্রেকিং রুট
আলীকদম বাজার বা পানবাজার থেকে স্থানীয় পরিবহন নিয়ে আমতলী ঘাট, দুছরি বাজার ও আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় যাওয়া যায়। স্থানীয় পরিস্থিতি ও অনুমতির ওপর নির্ভর করে মেনিয়াং পাড়া, খেমচং পাড়া হয়ে রুংরাং/ক্রিসতং ট্রেইল ধরে লিবলুহুং সামিটের দিকে এগোনোর রুট ব্যবহার করা হয়। ফেরার পথ স্থানীয় গাইড ও আবহাওয়ার পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারণ করাই নিরাপদ।
প্রকৃতির কাছে, প্রকৃতির দায়িত্বে
লিবলুহুংয়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে পাহাড়ের পরিবেশ নষ্ট না করাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। প্লাস্টিক, বোতল বা অন্য কোনো বর্জ্য ফেলে আসা যাবে না। ঝিরির পানিতে সাবান-শ্যাম্পু ব্যবহার, গাছের ডাল ভাঙা, পাহাড়ে নাম লেখা কিংবা স্থানীয় মানুষের অনুমতি ছাড়া ছবি তোলা থেকেও বিরত থাকতে হবে।
শহুরে জীবনের ব্যস্ততা থেকে দূরে, পাহাড়ি অরণ্যের নিস্তব্ধতা আর মেঘের কাছাকাছি কয়েকটি দিন কাটানোর অভিজ্ঞতা চাইলে লিবলুহুং হতে পারে অনন্য এক অভিযান। তবে এই পাহাড় ‘জয়’ করার চেয়ে প্রকৃতি, স্থানীয় মানুষ ও পাহাড়ের নিজস্ব পরিবেশকে সম্মান করেই ফিরে আসাটাই হওয়া উচিত প্রকৃত ভ্রমণসার্থকতা।




