দুই শতকের ঐতিহ্য ‘নৌকাগ্রাম’ আটেরপাড়া

ছবি: আগামীর সময়
শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার ছয়গাঁও ইউনিয়নের আটেরপাড়া গ্রামে ঢুকতেই কানে ভেসে আসে হাতুড়ির টুংটাং শব্দ, করাতের ঘর্ষণ আর পেরেক ঠোকার ছন্দ। গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনাজুড়ে সারি সারি কাঠের গুঁড়ি, ফাড়াই করা তক্তা ও আধা-তৈরি নৌকা। এখানকার মানুষের কাছে নৌকা শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, এটি তাদের পরিচয়, সংস্কৃতি ও বংশপরম্পরায় বহন করে চলা এক অমূল্য ঐতিহ্য। এখানকার শতাধিক পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নৌকা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। এ কারণেই এলাকাজুড়ে আটেরপাড়া পরিচিত হয়ে উঠেছে ‘নৌকাগ্রাম’ নামে।
একসময় নদীমাতৃক এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান বাহন ছিল নৌকা। আধুনিক সড়ক যোগাযোগের বিস্তার ও নদীপথের সংকোচনের ফলে সেই চাহিদা কমে এলেও আটেরপাড়ার কারিগররা এখনও নিষ্ঠার সঙ্গে ধরে রেখেছেন শতবর্ষের ঐতিহ্য। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিকল্পিত উদ্যোগ পেলে এই নৌকা শিল্প শুধু দেশের ঐতিহ্য রক্ষাই করবে না, গ্রামীণ অর্থনীতিতেও রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
নৌকা তৈরির কারিগর ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় দুই শতাব্দি ধরে এই গ্রামে বংশপরম্পরায় নৌকা তৈরির ঐতিহ্য চলে আসছে। ছোটবেলা থেকেই শিশুরা বাবা, চাচা কিংবা দাদার পাশে দাঁড়িয়ে শিখে নেয় কাঠ বাছাই, কাটিং, পেরেক বসানো থেকে শুরু করে একটি নৌকা তৈরির পুরো প্রক্রিয়া।
বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই আটেরপাড়ায় বেড়ে যায় কর্মব্যস্ততা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাঠ, হাতুড়ি ও করাত হাতে ব্যস্ত সময় কাটান কারিগররা। তৈরি হওয়া নৌকা বিক্রি হয় স্থানীয় হাট-বাজারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। দক্ষ একজন কারিগর দিনে একটি ছোট নৌকা তৈরি করতে পারেন। তবে বড় নৌকা বানাতে সময় লাগে তিন থেকে সাত দিন। একটি ছোট নৌকা তৈরিতে খরচ হয় চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা, যা বিক্রি হয় সাত থেকে আট হাজার টাকায়। বড় নৌকা তৈরিতে ব্যয় হয় আট থেকে নয় হাজার টাকা এবং বিক্রি হয় দশ থেকে বারো হাজার টাকায়।
এ অঞ্চলের নৌকা শরীয়তপুরের বুড়িরহাট, ভোজেশ্বর বাজার, কাজির হাট, গোসাইরহাট বাজারসহ জেলার একাধিক হাটে সিজনে প্রায় কোটি টাকা বিক্রি হয়। একসময় এক-মালাই নৌকার বিক্রি সর্বোচ্চ থাকলেও কালের বিবর্তনে সেগুলো আর তৈরি করা হয় না। বেচা-বিক্রি কম ও কাচামালের দাম বৃদ্ধি হওয়ায় এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছেন বহু কারিগর। বছরের তিন মাস নৌকা তৈরির কাজে থাকলেও বাকি নয় মাস গ্রামে ঘুরে পুরাতন ঘরবাড়ি মেরামতের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন কারিগররা।
প্রায় ৪০ বছর ধরে নৌকা তৈরির সঙ্গে যুক্ত নগেন বাইন। ১০ বছর বয়সে প্রথমবার বাবার সঙ্গে এই কাজে যুক্ত হয় তিনি। আজ ৫০ বছর পরও একই হাতুড়ি আর করাত নিয়ে কাজ করছেন। কাঠ কাটা আর পেরেক ঠোকার মধ্য দিয়েই এই কাজ শিখেছেন নগেন বাইন।
মৌসুমে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয় তাকে। কথা হয় নগেন বাইনের সঙ্গে। তিনি বলেন, একসময় আটেরপাড়ায় দুই শতাধিক পরিবার নৌকা তৈরির সঙ্গে জড়িত থাকলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। নদী-খাল ভরাট হয়ে যাওয়া, বিলগুলো সব মাছের ঘের হয়ে যাচ্ছে, পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া, নৌকার চাহিদা হ্রাস এবং কাঠসহ বিভিন্ন উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে এই ঐতিহ্যবাহী পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। সরকার যদি আধুনিক প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা দিত, তাহলে আরও উন্নত মানের নৌকা তৈরি করে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হতো।
তিনি এই পেশায় থাকলেও সন্তানদের আর এই পেশায় আনতে চায় না নগেন। হাড়ভাংগা খাটুনি ও মজুরি কম হওয়ায় ছেলেদের অন্য পেশায় যুক্ত করেছেন তিনি।
প্রায় ৬৫ বছর ধরে নৌকা তৈরির কাজে জড়িত ৮০ বছর বয়সী গৌরাঙ্গ বাইন। কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেন, আগে সারা বছরই নৌকার কাজ ছিল। বিভিন্ন জেলায় গিয়ে নৌকা তৈরি করতাম। এখন বর্ষার আগে কিছু অর্ডার আসে, এরপর কাজ অনেকটাই কমে যায়। একসময় আমাদের এখানে এক-মালাই নৌকা, ট্রলারসহ বিভিন্ন ধরনের নৌকা তৈরি হতো। এখন কাচামালের দাম বৃদ্ধি ও খালবিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় এই পেশায় মানুষ আসতে চায় না। ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে আমাদের কিছু পরিবার এখন এই পেশায় যুক্ত আছে। সরকারি সহযোগিতা না পেয়ে এই কাজ অচিরেই বন্ধ হয়ে যাবে।
কারিগররা জানান, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নৌকা তৈরির কাজেও এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। হাতের কাজের পাশাপাশি এখন অনেকেই কাঠ কাটাসহ বিভিন্ন ধাপে আধুনিক মেশিন ব্যবহার করছেন। পরিবারের নারী ও শিশুরাও এই শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা দড়ি, পাল, কাঠের আসনসহ নৌকার বিভিন্ন আনুষঙ্গিক উপকরণ তৈরি করেন। বছরের প্রায় তিন মাস নৌকা তৈরির কাজ চলে। বাকি সময় পুরোনো ঘরবাড়ি মেরামতের কাজ করে সংসার চালান অনেক কারিগর।
স্থানীয় সাংবাদিক ও পরিবেশকর্মী আশিকুর রহমান বলেন, আটেরপাড়ার নৌকা শিল্প শুধু একটি পেশা নয়, এটি আমাদের লোকঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। কিন্তু বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা, নদী-খাল সংকুচিত হওয়া এবং বাজার সংকটের কারণে এই শিল্প আজ অস্তিত্বের সংকটে। কারিগরদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ এবং কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব।
ভেদরগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী অফিসার মো.আবুবকর সিদ্দিক বলেন, আটেরপাড়ার কারিগররা শত বছরের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। তাদের দক্ষতা ও শ্রম সত্যিই প্রশংসনীয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণ, বাজার সংযোগ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আরও বিকশিত হয়।




