মুক্তিপণ নিয়েও ছাড়েনি বনদস্যুরা, ১০ দিন ধরে জিম্মি চার জেলে

সংগৃহীত ছবি
সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে গিয়ে বনদস্যুদের হাতে অপহৃত হওয়ার ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও মুক্তি মেলেনি সাতক্ষীরার শ্যামনগরের চার জেলের। পরিবারের সদস্যরা দস্যুদের দাবিকৃত দুই লাখ ৪০ হাজার টাকা মুক্তিপণ পরিশোধ করলেও তারা এখনও বাড়ি ফিরতে পারেননি। দস্যুদের পক্ষ থেকে নানা অজুহাত দেখানোয় স্বজনদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা ও অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে।
অপহৃত জেলেরা হলেন শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের কুলতলী গ্রামের সুলতান খাঁর ছেলে শাহাজান খাঁ, দিলবার খাঁর ছেলে ইয়াছিন খাঁ, একই ইউনিয়নের হরিনগর গ্রামের আব্দুল গফুরের ছেলে শাহাজান আলী এবং নজরুল গাইনের ছেলে শরিফুল ইসলাম।
স্বজন, মহাজন এবং মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে আসা অন্য জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২৫ মে কদমতলা স্টেশন থেকে বৈধ পাস নিয়ে সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে যান তারা। বন বিভাগের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ৩১ মে রাতের মধ্যেই তাদের লোকালয়ে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু ওই দিন রাত ১১টার দিকে পশ্চিম সুন্দরবনের মালঞ্চ নদীর চালতেবেড়ে খাল ও সুবদে খাল এলাকায় ৫টি মাছ ধরার নৌকায় অভিযান চালিয়ে বনদস্যুরা ৬ জেলেকে অপহরণ করে। অপহরণকারীরা নিজেদের কুখ্যাত ‘নানাভাই/ডন বাহিনী’র সদস্য বলে পরিচয় দেয় এবং পরে মুক্তিপণ দাবি করে।
অভিযোগ রয়েছে, মুন্সিগঞ্জের মৌখালীর আটির ওপর এলাকার সফিকুল ও শাহাজানের নেতৃত্বাধীন ‘নানাভাই বাহিনী’ প্রথমে চার জেলের মুক্তির জন্য সাড়ে তিন লাখ টাকা দাবি করে। পরে দেনদরবারের মাধ্যমে দুই লাখ ৪০ হাজার টাকায় সমঝোতা হয়। মুক্তিপণের টাকা পরিশোধের পরও তাদের মুক্তি না পাওয়ায় স্বজনদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
অপহৃত জেলে শাহাজান খাঁর চাচাতো ভাই আবুল হোসেন জানান, অন্য কয়েকজন জেলেকে তুলনামূলক কম মুক্তিপণে ছেড়ে দেওয়া হলেও শাহাজানসহ চারজনকে এখনও আটকে রাখা হয়েছে।
তার ভাষ্য, ‘দস্যুরা প্রথমে তিনজনের জন্য মাথাপিছু ৫০ হাজার টাকা এবং ইয়াছিনের জন্য দুই লাখ টাকা দাবি করেছিল। পরে সমঝোতার ভিত্তিতে ইয়াছিনের জন্য এক লাখ ২০ হাজার টাকা এবং বাকি তিনজনের জন্য ৪০ হাজার টাকা করে বিকাশের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরও তাদের মুক্তি দেওয়া হয়নি।’
জিম্মি এক জেলের বাবা জানান, তার ছেলে দুই সহযোগীকে নিয়ে নৌকায় ঘুমিয়ে ছিল। গভীর রাতে দস্যুরা নৌকার পাশে এসে ডাকাডাকি শুরু করলে তার ছেলে প্রথমে মনে করেছিল বাঘ আক্রমণ করেছে। আত্মরক্ষার জন্য হাতে থাকা দা নিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করলে দস্যুরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পরে ছেলেসহ অন্যদের মারধর করে বেশি মুক্তিপণ দাবি করে। অনেক কষ্টে টাকা জোগাড় করে পরিশোধ করেছি। এখন বলা হচ্ছে নৌকা না পাওয়ায় তাদের ছাড়া যাচ্ছে না। আমরা খুব দুশ্চিন্তায় আছি।
স্বজনদের অভিযোগ, দস্যুরা এখন নতুন করে নানা অজুহাত দেখাচ্ছে। তাদের দাবি, সুন্দরবনে চলমান তিন মাসের সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে বনাঞ্চলে নৌযান চলাচল কমে গেছে। ফলে অপহৃতদের লোকালয়ে পৌঁছে দেওয়ার মতো নৌকা পাওয়া যাচ্ছে না। তবে এ ব্যাখ্যা পরিবারগুলোর সন্দেহ ও উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
মুক্তিপণের টাকা পরিশোধের পরও জেলেদের না ছাড়ায় গত রবিবার অপহৃতদের কয়েকজন মহাজন ও পরিবারের সদস্য সুন্দরবনের অভ্যন্তরের একটি খালে যান। দস্যুরা সেখানে জেলেদের অবস্থানের কথা জানিয়েছিল বলে দাবি করেন তারা। কিন্তু টানা দুই রাত খোঁজাখুঁজির পরও অপহৃতদের কোনো সন্ধান না পেয়ে ফিরে আসেন। এরপর থেকে পরিবারগুলোর উৎকণ্ঠা আরও বেড়েছে।
স্বজনদের আশঙ্কা, মুক্তিপণ নেওয়ার পরও জেলেদের আটকে রাখার পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে। মঙ্গলবার পর্যন্ত চার জেলের মুক্তি না মেলায় তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। দ্রুত তাদের নিরাপদে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ দাবি স্বজনদের।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. মশিউর রহমান বলেছেন, ‘জুন মাসের শুরু থেকে সুন্দরবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ রয়েছে। অপহৃত জেলেরা নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আগেই মাছ ধরতে বনে প্রবেশ করেছিলেন। ফেরার পথে তারা দস্যুদের কবলে পড়েন।’
শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান মন্তব্য করেন, ‘সাধারণত সুন্দরবনে কোনো জেলে জিম্মি হলে তাদের সহযোগী ও স্বজনরা নিজেরাই সমঝোতার মাধ্যমে মুক্ত করার চেষ্টা করেন। এ কারণে অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিষয়টি জানানো হয় না। তবে ঘটনাটি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।’





