কোটি টাকার বাজেট আসে, ভাগ্য বদলায় না চা শ্রমিকদের

চা পাতা সংগ্রহ করছেন এক নারী- আগামীর সময়
ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘর থেকে বের হতে হয় তাদের। সারাদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে চা পাতা সংগ্রহের কাজ শেষে পাওয়া মজুরি দিয়ে কোনোমতে চলে সংসার। প্রতিবছর জাতীয় সংসদে হাজার হাজার কোটি টাকার আয়-ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরে বাজেট ঘোষণা হয়। কিন্তু চা শ্রমিকদের অভিযোগ, জাতীয় বাজেটের সুফল পান না তারা।
উন্নয়ন, অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে বরাদ্দের ঘোষণা হয়। দিনভর কঠোর পরিশ্রম করেও ন্যায্য মজুরি, উন্নত আবাসন, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিতই থেকে যান চা শ্রমিকরা।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের জেরিন চা বাগানের শ্রমিক অনু ছত্রী। তিনি বললেন, ‘বাজেট কী? সেখানে আমাদের জন্য কী থাকে? এসব আমরা খুব একটা বুঝি না। শুধু শুনি বাজেট ঘোষণা হয়। কিন্তু বাজেট হলেও আমাদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসে না। আমরা সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করি। অথচ চাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম বাড়লেও সেই অনুপাতে আমাদের মজুরি বাড়ে না। সংসার চালানো দিন দিন আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।’
শুধু অনু ছত্রী নন, তার মতো হাজারো চা শ্রমিকের কণ্ঠে একই ধরনের হতাশা ও বঞ্চনার কথা শোনা যায়। তাদের দাবি, দেশ-বিদেশে চায়ের চাহিদা বাড়লেও শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে জাতীয় বাজেটে রয়েছে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি।
একই বাগানের শ্রমিক প্রতিমা মুন্ডা। তিনি বলছেন, ‘প্রতিবছর বাজেটে কোটি কোটি টাকার হিসাব ঘোষণা করা হয়। আমরা টেলিভিশনে দেখি। অথচ আমাদের দৈনিক মজুরি মাত্র ১৮৭ টাকা। এই আয়ে পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাই কঠিন।’
চা শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি ন্যূনতম ও ন্যায্য মজুরি। কিন্তু বছরের পর বছর শোষণের শিকার তারা। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েই চলেছে। কিন্তু বাড়ে না মজুরি।
শ্রমিক সোনিয়া রবিদাসের ভাষ্য, ‘আমরা চাই আমাদের সন্তানরা ভালোভাবে পড়াশোনা করুক। অসুস্থ হলে যথাযথ চিকিৎসা পাক। গরিব মানুষের জন্য স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে আরও বেশি বরাদ্দ এবং কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।’
বিভিন্ন চা বাগান ঘুরে দেখা গেছে, বিশুদ্ধ পানির সংকট। অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা। জরাজীর্ণ আবাসন এবং সীমিত স্বাস্থ্যসেবা চা শ্রমিকদের নিত্যসঙ্গী। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতেও নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবস্থা। শিশুদের মানসম্মত শিক্ষার সুযোগও সীমিত।
শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুড়ভুড়িয়া চা বাগানের শ্রমিক অলকা ভৌমিক। তিনি বলছিলেন, ‘বাজেটের কথা শুনি। কিন্তু আমাদের জীবনে তার কোনো প্রভাব দেখি না। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা বজ্রপাতের মধ্যেও কাজ করতে হয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই জীবিকার জন্য মাঠে নামতে হয়। বাজারে দ্রব্যমূল্য যেভাবে বাড়ছে, তাতে আমাদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষের বেঁচে থাকাই কঠিন।’
চা শ্রমিকদের দাবি, আসন্ন জাতীয় বাজেটে তাদের মজুরি বৃদ্ধি, আবাসন উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং শিশুদের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখতে হবে।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি পঙ্কজ কন্দ বললেন, বাজেট কী এবং সেখানে চা শ্রমিকদের জন্য কী বরাদ্দ থাকে, সে সম্পর্কে অধিকাংশ শ্রমিকের কোনো ধারণা নেই। চা শ্রমিকদের নিজস্ব ভিটেমাটি নেই। ভূমির অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত। অতীতে আমাদের দাবিগুলো বাজেটে খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, জাতীয় বাজেটে চা শ্রমিকদের জন্য আলাদা ও নির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখা হবে। এতে তাদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আমরা মনে করি।




