মুক্তাগাছার যে গ্রামে শত বছর ধরে তৈরি করা হয় মাছ ধরার ছিপ

ছবি: আগামীর সময়
সকাল গড়াতেই ব্যস্ত হয়ে ওঠে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার মানকোন ইউনিয়নের ছোট্ট গ্রাম বাদে মাঝিরা। কারও হাতে ধারালো দা, কেউ বাঁশ চেঁছে মসৃণ করছেন, কেউ আবার আগুনের তাপে বাঁশ সোজা করছেন। উঠান জুড়ে সারি সারি কঞ্চিবাঁশ, বারান্দায় শুকাতে দেওয়া আধা-তৈরি ছিপ। পুরো গ্রাম যেন একটি বিশাল কর্মশালা। এখানে বাঁশের প্রতিটি টুকরোই একেকটি পরিবারের স্বপ্ন আর জীবিকার গল্প বহন করে।
প্রায় শত বছরেরও ঐতিহ্য ধরে এই গ্রামে তৈরি হচ্ছে মাছ ধরার ছিপ। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়া এই কুটিরশিল্প আজও ধরে রেখেছে তার ঐতিহ্য। স্থানীয়দের মতে, বর্তমানে গ্রামের অন্তত তিন শতাধিক পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত।
বর্ষা এলেই গ্রামের চিত্র বদলে যায়। কাজের চাপ বেড়ে যায় কয়েক গুণ। তখন বাড়ির উঠান, বারান্দা, এমনকি ঘরের ভেতরেও চলে ছিপ তৈরির ব্যস্ততা। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা এসে কিনে নিয়ে যান হাজার হাজার ছিপ।
কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছিপ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ ধরনের কঞ্চিবাঁশ সংগ্রহ করা হয় সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনার বিভিন্ন এলাকা থেকে। প্রথমে নারীরা বাঁশের খোসা ছাড়িয়ে মসৃণ করেন। এরপর আগুনে সেঁকে বাঁশ সোজা করা হয় এবং কাঙ্ক্ষিত রং আনা হয়। সবশেষে দক্ষ কারিগরের হাতে সেটি মাছ ধরার উপযোগী ছিপে পরিণত হয়।
গ্রামের প্রবীণ কারিগর আলতাব উদ্দিনের বয়স ষাট পেরিয়েছে। জীবনের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ছিপ তৈরির কাজে। তিনি বলেছেন, আমাদের গ্রামে বছরে লাখ লাখ ছিপ তৈরি হয়। বর্ষা মৌসুম এলে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা ট্রাকভর্তি ছিপ কিনে নিয়ে যান। উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোয় এসব ছিপের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
ছিপ তৈরির সঙ্গে জড়িয়ে আছেন গ্রামের নারীরাও। গৃহস্থালির কাজের ফাঁকে বাঁশ প্রস্তুতের কাজে অংশ নেন তারা। এতে সংসারের আয় বাড়ছে, পাশাপাশি নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণও নিশ্চিত হচ্ছে।
কারিগরদের হিসাবে, একজন দক্ষ কারিগর প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। বাঁশ চেঁছে প্রস্তুত করার জন্য গৃহবধূরা প্রতিটি বাঁশের বিপরীতে ১ টাকা করে মজুরি পান। আর একটি ছিপ তৈরি করে কারিগররা পান ৮ থেকে ১০ টাকা।
৩৫ বছর বয়সী কারিগর সুজন মিয়া বলেছেন, বর্ষা মৌসুমে ছিপ বিক্রি করেই বছরে ১ লাখ টাকার বেশি আয় করতে পারি। এই কাজই আমার পরিবারের প্রধান ভরসা।
একই গ্রামের তরুণ কারিগর রাজু হাসান বলেছেন, অন্যের খেতে দিনমজুরি করলে স্বাধীনভাবে কাজ করা যায় না। বাপ-দাদার শেখানো এই কাজ করেই আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। প্রতিদিন ৮০ থেকে ৯০টি ছিপ তৈরি করতে পারি। এতে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় হয়।
গ্রামের কিশোর ও শিক্ষার্থীরাও পড়াশোনার ফাঁকে পরিবারের কাজে সহযোগিতা করে। ফলে ছিপ তৈরির এই শিল্প শুধু একটি পেশা নয়, বরং গ্রামটির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।
লোকজ লেখক ও গবেষক এম ইদ্রিছ আলী বলেন, বর্তমানে ফিশিং হুইলের ব্যবহার বাড়লেও বড়শির ছিপের আলাদা কদর রয়েছে। বাদে মাঝিরার তৈরি ছিপ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সৌখিন ও পেশাদার মাছ শিকারিদের কাছে সমানভাবে জনপ্রিয়।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিবছর এই গ্রাম থেকে ১০ থেকে ১৫ লাখ ছিপ দেশের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করা হয়। ফলে বাদে মাঝিরা এখন দেশের অন্যতম ছিপ উৎপাদনকারী গ্রাম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ছিপ তৈরির কারখানার মালিক আমিনুল ইসলাম বলেছেন, বর্ষার শুরুতেই প্রায় তিন লাখ টাকার ছিপ বিক্রি হয়েছে। কিন্তু পরিবহন ব্যয় ও কাঁচামালের দাম বাড়ায় আগের মতো লাভ হচ্ছে না। বৃষ্টির পরিমাণের ওপরই মূলত বিক্রি নির্ভর করে। খাল-বিলে যত বেশি পানি হবে, চাহিদাও তত বাড়বে। এ বছর পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকার ছিপ বিক্রির আশা করছি।
কারিগরদের আশার কথা শুনিয়েছেন মুক্তাগাছা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জহিরুল ইসলামও। তার ভাষ্য, সম্প্রতি বাঁশ ও অন্যান্য কুটিরশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ৩০ জন কারিগরকে ১০ দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ চলাকালে প্রত্যেককে ১ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে তাদের ১৮ হাজার টাকা করে মূলধন সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী ব্যাচে ছিপ তৈরির কারিগরদেরও প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে।
শত বছরের ঐতিহ্য, শত শত মানুষের জীবিকা আর গ্রামীণ অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাদে মাঝিরার বাঁশের ছিপ শিল্প। সরকারি সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ ও বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ পেলে এই ঐতিহ্য আরও দূর এগিয়ে যাবে, এমন প্রত্যাশাই গ্রামের কারিগরদের।





