জালে মাছ নয়, উঠছে নদী গিলে খাওয়া সাকার ফিশ

ছবি: আগামীর সময়
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। গাজীপুরের কালীগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর ভেসে আছে হালকা কুয়াশার চাদর। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে পুরনো জালটা ধীরে ধীরে গোছাচ্ছিলেন জেলে লিটন মিয়া। তার চোখে ছিল বহু বছরের নদীজীবনের স্মৃতি, যখন এই শীতলক্ষ্যায় জাল ফেললেই জাল ভরে উঠত রুই, কাতলা, বোয়াল, টেংরা আর শোল মাছ।
জাল ছুড়ে দিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন লিটন। তারপর ধীরে ধীরে টেনে তুলতেই তার মুখটা মলিন হয়ে যায়। জালে রুপালি মাছের ঝিলিক নেই। আছে কালচে রঙের শক্ত খোলসে ঢাকা, কাঁটায় ভরা অদ্ভুত কিছু মাছ। দেখতে যেন পানির নিচের কোনো দানব।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে লিটন মিয়া বললেন, ‘আগে এই নদী আমাদের সংসার চালাত। এখন জাল ফেললেই শুধু সাকার ফিশ উঠে আসে। দেশি মাছ যেন হারিয়েই গেছে।’
গত এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন তার জালে ৫ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত সাকার ফিশ ধরা পড়ছে। কিন্তু সেই মাছ কিনতে চায় না কেউ। নদীর তীরে স্তূপ হয়ে পড়ে থাকা মাছগুলোর দিকে তাকিয়ে হতাশ গলায় তিনি বলেছেন, ‘মাছ ধরছি ঠিকই, কিন্তু বিক্রি হয় না। পরিশ্রমটাই যেন পানিতে যাচ্ছে।’
শীতলক্ষ্যার তীরে এখন এই দৃশ্য যেন নিত্যদিনের বাস্তবতা। নদীর পাড়ের আরেক বাসিন্দা আমান মিয়া অবসরে শখের বশে ঝাঁকিজাল নিয়ে মাছ ধরতে আসেন। সেদিনও জাল হাতে নদীতে নেমেছিলেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত দেশি মাছের দেখা পাননি।
তিনি বলছেন, ‘জাল যেদিকেই ফেলি, সেদিক থেকেই এই কাঁটাওয়ালা মাছ উঠে আসে। একবার জাল টানলেই তিন-চার কেজি পর্যন্ত সাকার ফিশ পাওয়া যায়।’
তার মতে, এই মাছ শুধু জেলেদের ক্ষতিই করছে না, নদীর স্বাভাবিক পরিবেশকেও বদলে দিচ্ছে। কারণ নদী থেকে তুলে তীরে ফেলে রাখলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বেঁচে থাকে এই মাছ।
আমান মিয়ার কণ্ঠে উদ্বেগ, ‘মানুষ খায় না, বাজার নেই। কিন্তু বেঁচে থাকার ক্ষমতা এত বেশি যে নদী দখল করে ফেলছে।’
কালীগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদী-তীরবর্তী ভাদার্ত্তী দক্ষিণপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সাইফুর রহমান ছোটবেলার নদী আর এখনকার নদীর মধ্যে বিশাল পার্থক্য দেখেন।
তিনি বলছেন, ‘আগে নদীতে ছোট মাছের ঝাঁক দেখা যেত। এখন সাকার ফিশ ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না।’
তার অভিযোগ, এই মাছ ছোট মাছের ডিম খেয়ে ফেলে এবং অন্য মাছের খাবারও দখল করে নেয়।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার এক বন্ধু আল আমিন সরকার সুমন বলেছেন, ‘দেখতেই ভয় লাগে। মনে হয় পানির নিচের কোনো দানব। এই মাছ আসার পর ছোট মাছ প্রায় দেখাই যায় না।’
ওই গ্রামের অপর এক বাসিন্দা মনির হোসেনের চোখে আরও বড় শঙ্কা ‘কারখানার বর্জ্যে নদী এমনিতেই অসুস্থ। তার ওপর এই মাছ যদি সব দেশি মাছের বংশ শেষ করে দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে শীতলক্ষ্যায় আর কোনো দেশি মাছ থাকবে না।’
স্থানীয়ভাবে ‘সাকার ফিশ’ নামে পরিচিত এই মাছের মূল আবাস দক্ষিণ আমেরিকা। অ্যাকোয়ারিয়ামে শৈবাল পরিষ্কার রাখার জন্য অনেকেই এটি পালন করেন। কিন্তু একসময় বিভিন্ন জলাশয়ে ছেড়ে দেওয়ার পর মাছটি দ্রুত বিস্তার লাভ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাকার ফিশ অত্যন্ত সহনশীল ও আগ্রাসী প্রকৃতির। কম অক্সিজেনযুক্ত পানিতেও বেঁচে থাকতে পারে। দ্রুত বংশবিস্তার করে এবং জলজ উদ্ভিদ, শৈবাল, মাছের ডিম ও ছোট প্রাণী খেয়ে ফেলে। ফলে দেশি মাছের খাদ্য ও প্রজননব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
কালীগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবু সামা বলছেন, ‘সাকার ফিশ একটি আগ্রাসী বিদেশি প্রজাতি। এটি নদীর স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য হুমকি। দেশি মাছের ডিম ও খাদ্য খেয়ে ফেলার কারণে স্বাভাবিক মাছ দ্রুত কমে যাচ্ছে।’
তিনি জানান, শুধু শীতলক্ষ্যাই নয়, দেশের বিভিন্ন নদী ও খালেও এখন এই মাছের বিস্তার দেখা যাচ্ছে।
নদী নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের স্থানীয়রা বলছেন, শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করলেই হবে না, এখন প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ। একই কথা বলেছেন, পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) স্থানীয় নেতারা।
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে কয়েকটি সম্ভাব্য সমাধানের কথা উঠে এসেছে।
মৎস্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে নদীতে বিশেষ অভিযান চালিয়ে সাকার ফিশ অপসারণ করতে হবে। জেলেদের প্রণোদনা দিয়ে এই মাছ বেশি বেশি ধরতে উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে।
যদিও স্থানীয়ভাবে এই মাছ খাওয়ার প্রচলন নেই, তবে কিছু দেশে এটি পশুখাদ্য ও মাছের খাদ্য তৈরিতে ব্যবহার হয়। গবেষণার মাধ্যমে এর বিকল্প ব্যবহার খুঁজে বের করা গেলে জেলেদের ক্ষতি কিছুটা কমতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দূষিত ও কম অক্সিজেনযুক্ত পানিতে সাকার ফিশ সহজে টিকে থাকে। তাই শিল্প-কারখানার বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
অ্যাকোয়ারিয়ামের বিদেশি মাছ খাল-বিল বা নদীতে ছেড়ে না দেওয়ার বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের অসচেতনতার কারণে এই মাছ ছড়িয়ে পড়েছে।
সরকারিভাবে দেশি প্রজাতির পোনা নদীতে অবমুক্ত এবং নিরাপদ প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করা গেলে ধীরে ধীরে ভারসাম্য ফিরতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একসময় যে শীতলক্ষ্যা ছিল জেলেদের আশার নদী, আজ সেই নদী যেন নীরবে সাহায্য চাইছে। দূষণে ক্লান্ত নদীর বুক জুড়ে এখন রাজত্ব করছে এক অনাহূত আগন্তুক-সাকার ফিশ।
তবুও প্রতিদিন ভোরে আবার জাল কাঁধে নদীর দিকে হাঁটেন লিটন মিয়া ও আমান মিয়ারা। হয়তো তাদের মনে এখনো একটুখানি আশা বেঁচে আছে-কোনো এক সকালে জাল টেনে তুললে আবারও দেখা মিলবে দেশি মাছের ঝিলিক।
কিন্তু শীতলক্ষ্যার বুক জুড়ে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, রাক্ষুসে সাকার ফিশের দাপটে কি হারিয়ে যাবে আমাদের নদীর চেনা মাছগুলো?






