শরণখোলা
দস্যু আতঙ্ক আর দুর্যোগ ঝুঁকি সাগরে যাওয়ায় বাধা জেলেদের

ছবি: আগামীর সময়
সমুদ্রে মৎস্য আহরণে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) মধ্যরাতে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর ফিশিং ট্রলার নিয়ে সাগরে যাওয়ার কথা জেলেদের। জাল-ট্রলার মেরামতসহ সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় তারা। মহাজনের আড়তে জড়ো হচ্ছেন জেলেরা, একে একে ট্রলার এসে ভিড়ছে ঘাটে। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই বাগড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিকূল আবহাওয়া।
সাগর উত্তাল থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। তাই সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে প্রথম দিনে সাগরে যাচ্ছে না বাগেরহাটের শরণখোলার অধিকাংশ ফিশিং ট্রলার। আবহাওয়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ধাপে ধাপে ট্রলারগুলো পাঠানো হবে সাগরে, এমনটাই জানিয়েছেন জেলে-মহাজনরা।
এ ছাড়া উপকূলের জেলে-মহাজনদের কাছে আরেক আতঙ্কের নাম বন ও জলদস্যু। সুন্দরবন ও সাগর উপকূলসংলগ্ন এলাকায় সক্রিয় রয়েছে একাধিক বন ও জলদস্যু বাহিনী। তারাও অপেক্ষায় জেলেদের।
দীর্ঘ প্রায় দুমাস অবসরে থাকার পর অনেক আশা নিয়ে মাছ ধরতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেও দস্যু আতঙ্ক জেঁকে বসেছে জেলে ও মহাজনদের মধ্যে। সাগরে নামলেই এসব দস্যু বাহিনীর হামলার শিকার হতে পারেন জেলেরা। এমন শঙ্কা ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে উপকূলের জেলেপল্লীতে।
বুধবার (১০ জুন) দুপুরে বাগেরহাটের শরণখোলা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, কিছু কিছু ট্রলার ঘাটে আসতে শুরু করেছে। প্রায় দুই মাস অবসর সময় কাটিয়ে জেলেরা জড়ো হচ্ছেন মহাজনের আড়তে। কেউ জাল তুলছেন ট্রলারে, কেউ করছেন ইঞ্জিন পরীক্ষা। শেষ মুহূর্তে এভাবেই ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।
এ সময় জেলে রফিকুল ও শান্ত জানালেন, অবরোধের (নিষেধাজ্ঞা) দুই মাস অনেক কষ্টে কেটেছে তাদের। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় ধারদেনা করে চলতে হয়েছে। এখন সাগরে মাছ ধরে সেই দেনা শোধ করতে হবে। আবহাওয়া ভালো থাকলে সাগরে যাবেন তারা। এ ছাড়া ডাকাতের ভয়ও তাড়া করছে তাদের। সাগরে যাতে নিরাপত্তা দেওয়া হয় সে ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে দাবি জানিয়েছেন তারা।
মৎস্য আড়তদার ও ট্রলার মালিক মজিবর তালুকদার ও কবির হাওলাদার জানালেন, নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে জাল ফেললে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। কিন্তু শুরুতেই বৈরী আবাহওয়া, যে কারণে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেও বেশির ভাগ ট্রলার সাগরে যাওয়া থেকে বিরত রয়েছে। আবাহওয়া ভালো হলে সেসব ট্রলার মাছ ধরতে সমুদ্রে রওনা হবে। তার ওপর রয়েছে দস্যু আতঙ্ক। ইলিশ মৌসুমের শুরুতেই উভয় সংকটে পড়ে অনেকটা হতাশাগ্রস্ত জেলে-মহাজনরা।
শরণখোলা সমুদ্রগামী ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মো. আবুল হোসেন বললেন, জাল-ট্রলার মেরামত এবং একটি ট্রলার সাগরে যাওয়ার উপযোগী করতে একেক মহাজনের কমপক্ষে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা খরচ হয়। অনেক মহাজন ঋণ নিয়ে করেছেন এসব কাজ। নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে মাছ ধরে তা বিক্রি করে শোধ করবেন সেই দেনা। কিন্তু প্রথম দিনই বৈরী আবহাওয়া হতাশ করেছে আমাদের। এমন পরিস্থিতিতে বেশিরভাগ মহাজন তাদের ট্রলার সাগরে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
দস্যুদের বিষয়ে জানতে চাইলে মৎস্যজীবী নেতা আবুল হোসেনের ভাষ্য, দস্যুরা আক্রমণ করলে গভীর সাগরে জেলেদের কিছুই করার থাকে না। দস্যু আতঙ্ক নিয়েই যেতে হয় সাগরে। অনেক সময় জেলেদের নির্যাতন, অপহরণ ও আহরিত মাছসহ ট্রলারের সবকিছু লুটে নেয় দস্যুরা। পুরো চালান শেষ করে খালি হাতে ফিরতে হয়। আর কোনো জেলে অপহরণ হলে গুনতে হয় লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ। তাই মৌসুমের শুরুতেই দস্যুদের ব্যাপারে কঠোর উদ্যোগ না নিলে ব্যাহত হবে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ আহরণ।
শরণখোলা উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা অঞ্জন বিশ্বাস বললেন, বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রাত ১২টার পর থেকেই সাগরে যেতে পারবেন জেলেরা। আবহাওয়া কিছুটা খারাপ থাকায় প্রথম দিন অনেকেই সাগরে ট্রলার না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিছু কিছু ট্রলার ঝুঁকি নিয়ে গেলেও গভীর সাগরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া দস্যুদের বিষয়টি আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যকর ব্যবস্থা নেবেন।







