গঙ্গাচড়ায় সার ডিলার নিয়োগে সবার আগে বিএনপি, অভিযোগ এমপির

রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় সার ডিলার নিয়োগে সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে দলীয় বিবেচনা ও স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তালিকায় বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের স্ত্রী, শ্যালক, জামাতা ও অন্যান্য স্বজনের নাম রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য ও তালিকা পর্যালোচনায় জানা গেছে।
এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী। তিনি বলেছেন, ‘সরকার ঘোষণা দিয়েছিল সবার আগে বাংলাদেশ। কিন্তু এই সার ডিলার নিয়োগে গঙ্গাচড়ায় সবার আগে বিএনপি প্রমাণিত হয়েছে।’
নিয়োগের তালিকা পুনর্বিবেচনা না করা হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিবাদ করবেন এবং সংসদে অনিয়মের তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরবেন বলেও জানালেন তিনি।
গত ৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত তালিকায় জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সার ডিলার নিয়োগের পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। এতে গত ২২ সেপ্টেম্বর পাঠানো স্মারকের ভিত্তিতে ‘সার ডিলার-সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি’র অনুমোদিত আবেদনকারীদের নির্ধারিত শর্তে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে অনুরোধ করা হয়। তালিকায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং কমিটির পক্ষে কৃষি অর্থনীতিবিদ শাহনাজ আক্তারের স্বাক্ষর রয়েছে।
গতকাল সোমবার বিকালে উপজেলা চত্বরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এমপি রায়হান সিরাজী অভিযোগ করেন, সার ডিলার নিয়োগের বাছাই কমিটিতে তার একজন প্রতিনিধি রাখার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পাশাপাশি একজন পেশাদার ব্যবসায়ী ও সরকারদলীয় একজন প্রতিনিধিকে কমিটিতে রাখার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। তবে তার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি। এ সময় তিনি পাঁচটি দেশ সফরে দেশের বাইরে ছিলেন বলে জানিয়েছেন।
রায়হান সিরাজী বললেন, ‘আমি তিন লাখ ৭৫ হাজার ভোটারের এমপি। আমার একজন প্রতিনিধি রাখেন। এই দাবি জানিয়েছিলাম। উনি আমার কথা রাখলেন না, উনি রাখলেন তার কথা। বলা হলো, ওপরের খুব চাপ! কমিটিতে রাখা যাবে না। এই ওপরের চাপ কোন চাপ?’
তার ভাষ্য, ‘বাছাই কমিটিতে তার প্রতিনিধি না থাকলেও নিয়োগপ্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখার দাবি জানিয়েছিলেন। বিশেষ করে কোলকোন্দ ইউনিয়নের চরাঞ্চলের তিনটি ওয়ার্ড ও নোহালী ইউনিয়নের চরাঞ্চলের মানুষের সার সংগ্রহের দুর্ভোগ বিবেচনায় নিয়ে ওই দুই ইউনিয়নে যোগ্য আবেদনকারীদের মধ্য থেকে ডিলার নিয়োগের অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু সেই দাবিও উপেক্ষা করা হয়েছে।
স্লোগান আছে সেবা নেই
১৩ অক্টোবর ২০২৬
নিয়োগের তালিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সংসদ সদস্য বললেন, ‘সরকারি নীতিমালাকে তোয়াক্কা না করে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বানরের পিঠা ভাগ হয়েছে।’
তার অভিযোগ, নিয়োগ পাওয়া কয়েকজনের সার ব্যবসা তো দূরের কথা, চালের ব্যবসারও অভিজ্ঞতা নেই। অথচ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ও পেশাদার ব্যবসায়ীদের ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গঙ্গাচড়া উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে মনোনীত ডিলারদের মধ্যে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের স্বজন এবং দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা রয়েছেন। তাদের কয়েকজনের পরিচয় ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো।
বেতগাড়ী ইউনিয়নে ‘মেসার্স মাহি ট্রেডার্স’-এর স্বত্বাধিকারী রুহুল কুদ্দুস। তার বাড়ি কিশামত শেরপুর। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রিপন মিয়ার ছোট ভাই। তার ছেলের নাম মাহি।
কোলকোন্দ ইউনিয়নে ‘এম এম ট্রেডার্স’-এর স্বত্বাধিকারী মো. গোলাম রব্বানী। তার বাড়ি কুড়িবিশ্বা। তিনি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব আলীর বড় শ্যালক। তিনি উপজেলা বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক বলেও জানা গেছে।
বড়বিল ইউনিয়নে ‘রাহি অ্যান্ড রাদ এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী মোছা. রুজিনা। তিনি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব আলীর স্ত্রী। তাদের দুই ছেলের নাম রাহি ও রাদ।
গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়নে ‘মেসার্স মা এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী মোছা. মোসলেমা বেগম। তার বাড়ি ভুটকা। তিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি চাঁদ সরকারের স্ত্রী।
লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের মহিপুর এলাকার ‘তিস্তা করপোরেশন’-এর স্বত্বাধিকারী মোছা. জহুরা বেগম। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তিনি বিএনপির সাবেক নেতা ওয়াহেদুজ্জামান মাবুর স্ত্রী এবং জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শরীফ নেওয়াজ জোহার মা।
গজঘণ্টা ইউনিয়নের জয়দেব উত্তর এলাকার ‘মেসার্স এল অ্যান্ড কে ট্রেডার্স’-এর স্বত্বাধিকারী মো. লোকমান হোসেন। তিনি আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বর্তমানে ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি বলে জানা গেছে। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলমের জামাতা।
মর্নেয়া ইউনিয়নের বড় রূপাই এলাকার ‘মেসার্স অনিমা এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী মো. আমিরুল ইসলাম। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক। নিজের নামেই তিনি ডিলারশিপ পেয়েছেন।
আলমবিদিতর ইউনিয়নের পাইকান মধ্যপাড়া এলাকার ‘মেসার্স লাবিবা এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী মো. আব্দুর রউফ বুলু। তিনি ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক এবং রংপুর-১ আসনে বিএনপির পরাজিত প্রার্থী মোকাররম হোসেন সুজনের খালাতো ভাই বলে প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
নোহালী ইউনিয়নের মদনপুর বৈরাতী এলাকার ‘মেসার্স স্বপন সার ঘর’-এর স্বত্বাধিকারী মো. মশিউর রহমান। তিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি চাঁদ সরকারের আত্মীয় বলে জানা গেছে। তবে তাদের সুনির্দিষ্ট আত্মীয়তার সম্পর্ক স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সার ডিলার নিয়োগের উপজেলা পর্যায়ের যাচাই-বাছাই কমিটিতে উপজেলা বিএনপির সভাপতি চাঁদ সরকার ও সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব আলী সদস্য ছিলেন বলে জানা গেছে। একই তালিকায় তাদের স্ত্রী ও আত্মীয়দের নাম থাকায় বাছাইপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে রাজনৈতিক পরিচয় বা পারিবারিক সম্পর্ক থাকাই নিয়োগে অনিয়মের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। এ ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের যোগ্যতা, মূল্যায়নের মানদণ্ড, কমিটির কার্যবিবরণী এবং নিয়োগের সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করা প্রয়োজন।
সার ডিলার নিয়োগের তালিকা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে রায়হান সিরাজী বলেছেন, প্রকৃত যোগ্য ব্যক্তিদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে রংপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক সভায়ও কথা বলেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
সংসদ সদস্যের অভিযোগ, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতা রয়েছে। এসব অভিযোগের পক্ষে তথ্য-প্রমাণ সংসদে তুলে ধরবেন তিনি। তালিকা পুনর্বিবেচনা করা না হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিবাদ করবেন এবং বিরোধী দলের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।
তিনি বললেন, ‘এটা বিক্ষোভের রূপ নেবে এবং জনরোষের রূপ নেবে।’
এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী গঙ্গাচড়া উপজেলা শাখার আমির মাওলানা নায়েবুজ্জামান, জামায়াত নেতা আশরাফুল আলম ও আতিকুজ্জামান আপেল এবং সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত সহকারী রিয়াদ হোসাইনসহ অন্যরা।




