স্লোগান আছে সেবা নেই

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়’— পরিবার পরিকল্পনার আছে এমন স্লোগান, কিন্তু প্রয়োজনের সময় মিলছে না তাদের সেবা। মাদারীপুরের কালকিনিতে গর্ভবতী নারী ও জন্মনিয়ন্ত্রণে আগ্রহীদের অভিযোগ, পরামর্শের জন্য ফোন করেও সাড়া মেলে না স্বাস্থ্যকর্মীদের। এর ওপর দীর্ঘদিন ধরে সংকট জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ও ওষুধের। মাঠকর্মীদের যাতায়াত ভাতার বিল থেকে কমিশন কাটার অভিযোগও উঠেছে। যদিও তা অস্বীকার করেছেন উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা।
কালকিনির রমজানপুর এলাকার বাসিন্দা আকলিমা আক্তার প্রথমবার মা হতে চলেছেন। এ সময়ে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ পাওয়ার কথা থাকলেও তাদের খুঁজে পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ। আকলিমা বলেন, ‘আমার এই প্রথম বেবি হবে। কিন্তু পরিবার পরিকল্পনার স্বাস্থ্যকর্মীরা এসে যে পরামর্শ দেবেন, তাদের আমরা পাই না। এখন তাদের ফোন করে জানতে চাইলে এ বিষয়ে পরে কথা বলতে বলা হয়।’
কালকিনির লামিয়া (২৩), মিনারা (২৮) ও দুলুফা (২৭) নামের কয়েকজন মায়ের সঙ্গেও কথা বলে জানা গেছে, তাদের কেউ কেউ পরিবার ছোট রাখতে আগ্রহী। কিন্তু প্রয়োজনের সময় পরামর্শ ও সহায়তা পেতে সমস্যায় পড়ছেন। জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে কী করণীয়, সে বিষয়েও যথাযথ দিকনির্দেশনা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন তারা।
সেবাগ্রহীতাদের এসব অভিযোগের বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের সহকারী পরিদর্শিকা মাসুমা ইয়াসমিন বলেছেন, ‘আমাদের কয়েকটি ইউনিয়নে যেতে হয়, লোকবল কম। তাই প্রতিটি গ্রামে ওইভাবে সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। আমরা প্রতিটি গ্রামে ঘুরে ঘুরে দেখি। প্রত্যেক অন্তঃসত্ত্বার কাছে আমাদের নম্বর দেওয়া আছে, আমরা সে অনুযায়ী তাদের সেবা দিই।’
এদিকে মাঠপর্যায়ে সেবা দিতে না পারার পেছনে যাতায়াত ভাতা নিয়ে জটিলতার কথা বলেছেন স্বাস্থ্য পরিদর্শিকা পারভিন আক্তার। তার অভিযোগ, টিএ/ডিএ বিল থেকে কমিশন কেটে নেওয়া হয়। এ কারণে মাঠে যাওয়া কমেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
পারভিন আক্তার বলেছেন, ‘আমরা চেষ্টা করি গাইডলাইন দিতে। এখন আর তাদের কাছে যাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের টিএ/ডিএ বিল নিয়ে ঝামেলা আছে। টিএ/ডিএ বিল থেকে কমিশন কেটে নেওয়া হয়। এ কারণে মাঠে কম যাওয়া হয়।’
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কালকিনি উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রহমান। তিনি বলেছেন, কারও টিএ/ডিএ বিল এখান থেকে কাটা হয় না। অনলাইনের মাধ্যমে প্রত্যেকের কাছে বিলের টাকা চলে যায়।
পরিবার পরিকল্পনা সেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ও প্রয়োজনীয় ওষুধের নিয়মিত সরবরাহ। তবে কালকিনি উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে এসব সামগ্রীর সংকট থাকার কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ও ওষুধের সংকট রয়েছে। মাঠকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতা তৈরির কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেছেন, কেউ দায়িত্ব পালন না করলে লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ ও মাঠকর্মীর বক্তব্যে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের মাঠপর্যায়ের সেবা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একদিকে লোকবল ও সরবরাহ সংকটের কথা বলছে বিভাগ, অন্যদিকে স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত না পাওয়ার অভিযোগ করছেন সেবাগ্রহীতারা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যাতায়াত ভাতার বিল থেকে কমিশন কাটার অভিযোগ, যা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অস্বীকার করেছেন।
কালকিনির সেবাগ্রহীতাদের প্রত্যাশা, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ও ওষুধের সংকট দূর করার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সেবার নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে টিএ/ডিএ বিল থেকে কমিশন কাটার অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে পরিবার পরিকল্পনার সেবা স্লোগানে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের ঘরে পৌঁছায়।




