রামেক হাসপাতালে শেষ যাত্রায়ও পদে পদে হয়রানি
- সহজে হাসপাতালে ঢুকতে পারে না বাইরের অ্যাম্বুলেন্স
- জরুরি মুহূর্তে স্বজনদের সামনে কার্যত বিকল্প থাকে না

সংগৃহীত ছবি
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে প্রতিদিনই মানুষের ভিড়। কেউ ছুটছেন স্বজনের জীবন বাঁচাতে। কেউ অপেক্ষা করছেন চিকিৎসার জন্য। আবার কেউ দাঁড়িয়ে থাকেন একটি অ্যাম্বুলেন্সের আশায়, যেটিতে করে হয়তো প্রিয় মানুষটিকে শেষবারের মতো বাড়ি নিয়ে যাবেন। এমন সংকটের মুহূর্তে অ্যাম্বুলেন্স হয়ে ওঠে পরিবারের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন। কিন্তু রামেক হাসপাতালে সেই অ্যাম্বুলেন্স পেতেই স্বজনদের পড়তে হচ্ছে ভাড়া, ‘সিরিয়াল’ ও নিয়ন্ত্রণের নানা জটিলতায়। অ্যাম্বুলেন্সের অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং একটি চক্রের নির্দিষ্ট কিছুসংখ্যক অ্যাম্বুলেন্সের বাইরে অন্য অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালে ঢুকতে না দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর ভোরে মাকে হারিয়ে এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হন আল মামুন। রামেক হাসপাতালে তার মা মারা যান। শোক সামলে তার সামনে তখন একটাই কাজ— মায়ের মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া। বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুরে। দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার। একটি অ্যাম্বুলেন্সের জন্য তার কাছে ৯ হাজার ৫০০ টাকা ভাড়া দাবি করা হয়।
ভাড়া বেশি মনে হওয়ায় বাইরে থেকে অ্যাম্বুলেন্স নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার অভিযোগ, হাসপাতালের বাইরে থেকে আসা বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সকে সহজে হাসপাতাল চত্বরে ঢুকতে দেওয়া হয় না। ফলে শেষ পর্যন্ত হাসপাতালকেন্দ্রিক অ্যাম্বুলেন্সচালকদের সঙ্গেই দর-কষাকষি করতে হয় তাকে।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন মো. হৃদয়। ভগ্নিপতির চিকিৎসা শেষে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটের বাড়িতে ফিরতে একটি অ্যাম্বুলেন্সের জন্য তার কাছেও ৯ হাজার ৫০০ টাকা দাবি করা হয়। হৃদয়ের হিসাবে, ওই যাত্রার ভাড়া সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ টাকা হওয়ার কথা। রোগীকে দ্রুত বাড়িতে নেওয়া, অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর কিংবা স্বজনের মরদেহ বাড়িতে নেওয়ার এমন জরুরি মুহূর্তে ভাড়া নিয়ে দীর্ঘ দর-কষাকষির সুযোগও থাকে না।
রামেক হাসপাতালে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স আছে ছয়টি। বিপুল রোগী ও স্বজনের প্রয়োজন মেটাতে তাই বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ওপর নির্ভরতা অনেক বেশি। আর সেই নির্ভরতার জায়গাতেই উঠেছে নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ।
ভুক্তভোগীদের দাবি, হাসপাতালের ভেতরে থাকা বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সগুলো ‘সিরিয়াল’ অনুযায়ী রোগী ও মরদেহ পরিবহনের সুযোগ পায়। বাইরের অ্যাম্বুলেন্স সহজে হাসপাতাল চত্বরে ঢুকতে পারে না। ফলে স্বজনের অ্যাম্বুলেন্স বেছে নেওয়ার সুযোগ সীমিত। বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া নিয়েও রয়েছে দীর্ঘদিনের বিতর্ক।
২০২১ সালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রথম ১০০ কিলোমিটারের জন্য প্রতি কিলোমিটারে ৩৫ টাকা এবং এরপর প্রতি কিলোমিটারে ৩০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অ্যাম্বুলেন্সের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ভাড়া ছিল প্রতি কিলোমিটারে ৪০ টাকা। তবে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক মো. মাহমুদের দাবি, এই ভাড়া নির্ধারণের পর প্রায় পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। ফলে পুরনো ভাড়ায় সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রাজশাহী জেলার সভাপতি আহমেদ সফিউদ্দিনের মতে, রোগী ও স্বজনদের নিজেদের পছন্দমতো অ্যাম্বুলেন্স নেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে।
হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শামীম আহমেদ জানিয়েছেন, এ সমস্যা নিরসনে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে বৈঠকে একটি কেন্দ্রীয় অ্যাম্বুলেন্স বুথ স্থাপনের প্রস্তাব এসেছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সগুলোর তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। সিরিয়াল অনুযায়ী রোগী পরিবহনের জন্য গাড়ি পাঠানো হবে। যাত্রার আগে গন্তব্য, নির্ধারিত অ্যাম্বুলেন্স ও ভাড়ার তথ্যও নথিভুক্ত করার কথা রয়েছে। এতে চালকের ইচ্ছামতো যাত্রী বেছে নেওয়ার সুযোগ কমবে।
রাজশাহী মহানগর জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সদস্য সচিব এমদাদুল হক লেমন অভিযোগ করেছেন, যুবদল ও আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী যৌথভাবে কথিত অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট পরিচালনা করছে।
তবে মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক শরিফুল ইসলাম জনি বলেছেন, যুবদলের কোনো নেতা বা কর্মী এর সঙ্গে জড়িত নন। বরং আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু ব্যক্তি এখনো অ্যাম্বুলেন্স কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন এবং তারা বিএনপির নাম ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।



