বর্ষা এলেই ভাঙনের শব্দ শুনি
সাগরে হারাচ্ছে ভিটামাটি
- পাঁচ দশকে কুতুবদিয়ার ৬০ শতাংশ স্থলভাগ বিলীন
- স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি বহু বছরের

কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায় সাগরে বিলীন হচ্ছে একের পর এক বাড়িঘর। মালামাল সরিয়ে নিচ্ছেন রোমাইপাড়ার বাসিন্দারা। ছবি: আগামীর সময়
বঙ্গোপসাগরের ঢেউগুলো যেন শুধু ঢেউ নয়, একেকটি ধ্বংসের দূত। প্রতিটি জোয়ারে একটু একটু করে সাগরের দিকে সরে যাচ্ছে কক্সবাজারের কুতুবদিয়া অঞ্চল। কোথাও বসতঘরের মেঝে ফেটে যাচ্ছে, কোথাও বেড়িবাঁধের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে, আবার কোথাও একটি পরিবারের শেষ আশ্রয়টুকু মিলিয়ে যাচ্ছে উত্তাল পানিতে।
সত্তরোর্ধ্ব হাছিনা বেগম নিজের ভাঙতে থাকা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মতো দেখেন, কীভাবে প্রতিটি ঢেউ তার জীবনের শেষ সম্বলটুকু গিলে খাচ্ছে। কিন্তু এই দৃশ্য শুধু একটি পরিবারের নয়। এটি দেশের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় দ্বীপ কুতুবদিয়ার বাস্তবতা, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রভাঙন আর দীর্ঘদিনের অবহেলায় প্রতিদিন ছোট হয়ে আসছে মানুষের বসবাসের জায়গা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বৈরী আবহাওয়া, অমাবস্যার জোয়ারে দুদিনেই অন্তত আটটি ঘর বিলীন হয়েছে সাগরে। ঝুঁকিতে রয়েছে আরও শতাধিক পরিবার।
উপজেলার বড়ঘোপ ইউনিয়নের রোমাইপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, হাছিনা বেগমের ঘরের প্রায় অর্ধেক বিলীন হয়েছে সাগরে। অবশিষ্ট অংশ ভাঙনের কিনারায় ঝুলছে। প্রতিবেশীরা নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বললেও তিনি যেতে চান না। কারণ এই ভিটাতেই তার স্বামীর স্মৃতি, সন্তানদের বেড়ে ওঠা, একটি জীবনের দীর্ঘ ইতিহাস।
কুতুবদিয়ায় স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি বহু বছরের। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, কার্যকর সমাধানের বদলে বারবার নেওয়া হয়েছে সাময়িক ব্যবস্থা। আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আকতার কামাল বলেছেন, ‘কোথাও কয়েকটি জিও ব্যাগ, কোথাও বালুর বস্তা, আবার কোথাও সামান্য মাটি ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু পরের জোয়ারেই সব ধুয়ে গেছে।’ তার আশঙ্কা, অমাবস্যার জোয়ারের প্রভাব কমলেও আগামী পূর্ণিমার জোয়ার পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে। তখন শত শত ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পড়বে ঝুঁকির মুখে। জরুরি ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলার দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য বলছে, উত্তর ধুরুংয়ের কাইছারপাড়া ও মিয়ারাকাটা, দক্ষিণ ধুরুংয়ের বাতিঘর, বড়ঘোপের রোমাইপাড়া এবং আলী আকবর ডেইলের সাইটপাড়া, কাহারপাড়া, কাজিরপাড়া ও তাবলেরচর এলাকায় বেড়িবাঁধের একাধিক অংশ রয়েছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়।
কক্সবাজার পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ নুরুল ইসলামের ভাষ্য, ‘ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোর তথ্য ও আলোকচিত্র পাঠানো হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। নেওয়া হয়েছে জরুরি সংস্কারকাজ শুরু করার প্রস্তুতিও। কুতুবদিয়ার আলী আকবর ডেইল, বায়ুবিদ্যুৎ এলাকা ও কাইছারপাড়ার প্রায় ১ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কারের অনুমোদন পাওয়া গেছে। পাশাপাশি মহেশখালীর কিছু এলাকায়ও শুরু হয়েছে সংস্কারকাজ।’
১৯৭২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ল্যান্ডস্যাট স্যাটেলাইট চিত্র, জিআইএস ও রিমোট সেন্সিং বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পাঁচ দশকে কুতুবদিয়ার প্রায় ৬০ শতাংশ স্থলভাগ সাগরে বিলীন হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষয় হয়েছে পশ্চিম ও দক্ষিণ উপকূলে। ডিজিটাল শোরলাইন অ্যানালাইসিস সিস্টেম (ডিএসএএস) অনুযায়ী, দ্বীপের দক্ষিণাংশে বছরে গড়ে প্রায় ৩৩ দশমিক ৭ মিটার পর্যন্ত উপকূল সাগরে হারিয়ে যাচ্ছে।
সে আশঙ্কা প্রকাশ পেয়েছে কুতুবদিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমানের বক্তব্যে। তিনি বলছেন, ‘সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দ্বীপটির বর্তমান আয়তন প্রায় ৩৫ বর্গকিলোমিটার। যে হারে ভাঙন চলছে, তাতে সেটি আরও কমে যেতে পারে।’
অবশ্য ভাঙন রোধের বিষয়ে কিছু পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা। তিনি জানিয়েছেন, কুতুবদিয়ায় স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য একটি প্রকল্প একনেকে প্রস্তাব আকারে রয়েছে। তবে এখনো সেটি অনুমোদনের অপেক্ষায়। আপাতত জিও ব্যাগ ও মাটি ফেলে জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে।




