রাজারহাট
পুঁজি টিকিয়ে রাখতেই দিশেহারা পোল্ট্রি খামারিরা

রাজারহাটের আহসান পোল্ট্রি ফার্মে উৎপাদন খরচ বেড়ে মুরগির বিক্রয়মূল্য কমে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় খামারি
পোল্ট্রি খাদ্য ও ওষুধের দাম বাড়ছে, বাড়ছে বিদ্যুৎ বিলও। অথচ বাজারে কমছে মুরগি ও ডিমের দাম। উৎপাদন খরচের চাপে একদিকে পুঁজি হারাচ্ছেন খামারিরা, অন্যদিকে বাড়ছে ঋণের বোঝা। লাভ তো দূরের কথা, খামার টিকিয়ে রাখাই এখন দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে কুড়িগ্রামের পোল্ট্রি উদ্যোক্তাদের।
জেলার রাজারহাট ও ফুলবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন খামার ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। রাজারহাটে ব্রয়লার মুরগি উৎপাদনকারী খামারিরা পোল্ট্রি খাদ্য, ওষুধ, বাচ্চা ও বিদ্যুতের বাড়তি খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অন্যদিকে ফুলবাড়ীতে ডিম উৎপাদনকারী খামারিরা উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
রাজারহাট উপজেলার বাছড়া এলাকার আহসান পোল্ট্রি ফার্ম এবং চাকিরপশার তালুক গ্রামের ভাই ভাই পোল্ট্রি ফার্মের চিত্র যেন একই সংকটের প্রতিচ্ছবি। আহসান পোল্ট্রি ফার্মে এক হাজার এবং ভাই ভাই পোল্ট্রি ফার্মে পাঁচ হাজার ব্রয়লার মুরগি পালন করা হয়। দুই খামারের হিসাব অনুযায়ী, এক মাসের ব্যবধানে উৎপাদন উপকরণের দাম বেড়েছে, অথচ মুরগি বিক্রি করে আয় কমেছে।
খামারি আহসান হাবীব হাসানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রতি বস্তা পোল্ট্রি খাদ্যের দাম ছিল ৩ হাজার ৩০০ টাকা। অক্টোবর মাসে তা বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। আহসান পোল্ট্রি ফার্মে প্রতি মাসে ৬০ বস্তা এবং ভাই ভাই পোল্ট্রি ফার্মে ৩০০ বস্তা খাবার প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ শুধু পোল্ট্রি খাদ্যের দাম বাড়ার কারণে দুই খামারে মাসিক ব্যয় বেড়েছে ৭২ হাজার টাকা।
একইভাবে বেড়েছে মুরগির বাচ্চার দাম। সেপ্টেম্বর মাসে প্রতিটি বাচ্চা কেনা হয়েছিল ৩২ টাকায়। অক্টোবর মাসে সেই বাচ্চার দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪ টাকায়। অর্থাৎ প্রতিটি বাচ্চার জন্য ১২ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে খামারিদের।
ওষুধ ও পরিচর্যার উপকরণের দামও বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। আহসান হাবীব হাসানের হিসাবে, রেস্টলিফের দাম সেপ্টেম্বর মাসে প্রতি লিটার ৬০০ টাকা থাকলেও বর্তমানে তা ৬৬০ টাকা। টু প্লাসের দাম ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৮০০ টাকা। পোল্ট্রি খাবার স্যালাইনের দাম প্রতি কেজি ১৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২০০ টাকা।
শুধু ওষুধ নয়, মুরগির ঘরের বিছানা তৈরির উপকরণেও বেড়েছে খরচ। আগে প্রতি কেজি তুষ বা লিটারের দাম ছিল ১০ টাকা, বর্তমানে তা ১৫ টাকা। কাঠের গুঁড়ার প্রতি বস্তার দাম ২০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩০০ টাকা। আহসান পোল্ট্রি ফার্মে প্রতি মাসে ৫০ কেজি তুষ ও ১০ বস্তা কাঠের গুঁড়া লাগে। অন্যদিকে ভাই ভাই পোল্ট্রি ফার্মে প্রয়োজন হয় ২০০ কেজি তুষ ও ৭০ বস্তা কাঠের গুঁড়া।
বিদ্যুৎ বিলেও এসেছে বড় ধাক্কা। আহসান পোল্ট্রি ফার্মে আগস্ট মাসে বিদ্যুৎ বিল ছিল ৩ হাজার টাকা, সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে হয়েছে ৫ হাজার টাকা। ভাই ভাই পোল্ট্রি ফার্মে আগে ৬ হাজার টাকা বিল এলেও সেপ্টেম্বরে দিতে হয়েছে ৮ হাজার টাকা।
তবে খামারিদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ মুরগির বিক্রয়মূল্য কমে যাওয়া। আহসান হাবীব হাসানের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয়েছে ১৪২ টাকা দরে। অক্টোবর মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১২৮ টাকায়।
এর প্রভাব পড়েছে দুই খামারের মাসিক বিক্রিতে। সেপ্টেম্বর মাসে আহসান পোল্ট্রি ফার্ম থেকে ১ হাজার ৯৯৫ কেজি মুরগি ১৪২ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে আয় হয়েছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ২৯০ টাকা। অক্টোবর মাসে ১ হাজার ৮০০ কেজি মুরগি ১২৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে পাওয়া গেছে ২ লাখ ৩০ হাজার ৪০০ টাকা। অর্থাৎ এক মাসে বিক্রির পরিমাণ ও দাম কমে মোট বিক্রি কমেছে ৫২ হাজার ৮৯০ টাকা।
অন্যদিকে ভাই ভাই পোল্ট্রি ফার্মে সেপ্টেম্বর মাসে ৯ হাজার কেজি মুরগি ১৪২ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে আয় হয়েছিল ১২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। অক্টোবর মাসে ৯ হাজার ১০০ কেজি মুরগি ১২৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে পাওয়া গেছে ১১ লাখ ৬৪ হাজার ৮০০ টাকা। বিক্রির পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও কম দামের কারণে মোট বিক্রি কমেছে ১ লাখ ১৩ হাজার ২০০ টাকা।
দুটি খামারের এই হিসাব শুধু বিক্রির চিত্র তুলে ধরে। এর বাইরে পোল্ট্রি খাদ্য, বাচ্চা, ওষুধ, বিদ্যুৎ, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহনসহ অন্যান্য ব্যয় মেটাতে হচ্ছে। ফলে প্রকৃত লাভ-লোকসানের হিসাব আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
আহসান হাবীব হাসান বলেন, ‘ফিড, বাচ্চা, ওষুধ, বিদ্যুৎ বিল, লিটার, তুষ ও গাড়িভাড়া—সবকিছুর দাম বাড়ছে। অথচ মুরগি বিক্রি করতে হচ্ছে কম দামে। সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরে মুরগির দাম কেজিতে ১৪ টাকা কমেছে। এভাবে চলতে থাকলে পথে বসতে হবে। ঋণ করে তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে খামার শুরু করেছিলাম, এখন সেই ঋণ পরিশোধ করাই কঠিন হয়ে পড়ছে।’
তিনি আরও জানান, সোনালী ব্যাংক ও ব্যুরো বাংলাদেশ এনজিও থেকে মোট পাঁচ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছেন। আহসান পোল্ট্রি ফার্ম নিজস্ব জায়গায় গড়ে তুলতে প্রায় দেড় লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। অন্যদিকে ভাই ভাই পোল্ট্রি ফার্মের জন্য ঘর ও শেড ভাড়া নিতে হয়। প্রতি মাসে ভাড়া বাবদ দিতে হচ্ছে ২০ হাজার টাকা। দুটি খামারে চারজন শ্রমিক কাজ করেন। তাঁদের পেছনে মাসে ব্যয় হয় প্রায় ১২ হাজার টাকা।
একই পরিস্থিতিতে রয়েছেন রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের মনিডাকুয়া গ্রামের খামারি আতিকুর রহমান ও রবিউল ইসলাম। আতিকুর রহমান বলেন, ‘আগে সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা লাভ হতো। কিন্তু যেভাবে ফিড, ওষুধ ও অন্যান্য খরচ বাড়ছে, তাতে এখন সেই লাভ থাকবে বলে মনে হচ্ছে না।’
আরেক খামারি রবিউল ইসলাম বলেন, ‘লাভের কথা বাদই দিলাম, এখন আসল পুঁজিটুকু টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা ধরে রাখা মুশকিল।’
অন্যদিকে ফুলবাড়ী উপজেলার বড়ভিটা ইউনিয়নের খেজুরের তল এলাকার মুন্সি পোল্ট্রি ফার্মেও একই সংকট দেখা দিয়েছে। খামারটির ব্যবস্থাপক আবদুর রহিম জানান, তাঁদের খামারে সাড়ে পাঁচ হাজার মুরগি রয়েছে। পোল্ট্রি খাদ্য, ওষুধ, বিদ্যুৎ বিল ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে একটি ডিম উৎপাদনে খরচ পড়ছে সাড়ে ৮ থেকে ৯ টাকা। অথচ বাজারে সেই ডিম বিক্রি করতে হচ্ছে ৯ থেকে সাড়ে ৯ টাকায়। ফলে অধিকাংশ সময়ই খরচের তুলনায় আয় খুব সামান্য থাকছে। কোনো কোনো সময় লোকসানও গুনতে হচ্ছে।
খামারের কর্মচারী একরামুল হক জানান, প্রতিদিন ডিমের বাজার ওঠানামা করে। কখনো চাহিদা কমে গেলে খামারিরা বিপাকে পড়েন। মালিক লাভ করতে না পারলে শ্রমিকদের জীবিকাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তাঁর ভাষায়, ‘মহাজন লাভ করতে না পারলে শ্রমিকরা কীভাবে বাঁচবে?’
একই খামারের আরেক কর্মচারী মিলন চন্দ্র বলেন, ভোর ৫টায় খামারে এসে প্রথমে মুরগিকে খাবার ও পানি দিতে হয়। এরপর খামারের মেঝে পরিষ্কারসহ অন্যান্য কাজ করতে হয়। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ডিম সংগ্রহ করা হয়। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে আবার ডিম সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা হয়। পরে ভ্যানে ডিম পাঠানোর প্রস্তুতি নিতে হয়। এত পরিশ্রমের পরও ডিমের দাম কমে গেলে তাঁদের চাকরি নিয়ে টানাটানি শুরু হয়। তখন তিনজনের পরিবর্তে দুজন কর্মচারী দিয়ে কাজ চালানো হয়। ফলে তাঁরাও আতঙ্কে থাকেন।
কুড়িগ্রাম জেলা পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি লিয়াকত আলী রিটু জানান, অনেক উদ্যোক্তা পুঁজি হারিয়ে ইতিমধ্যে পোল্ট্রি ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। খামারিদের টিকিয়ে রাখতে হলে ফিড ও ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক হারের পরিবর্তে কৃষকদের মতো বিশেষ হারে বিদ্যুৎ বিল নির্ধারণের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় বিনিয়োগ করেও খামারিদের পথে বসতে হবে।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রাম জেলায় বর্তমানে ২৭৫টি পোল্ট্রি খামার রয়েছে। এসব খামার থেকে প্রতিদিন প্রায় দুই লাখ ডিম উৎপাদিত হয়। জেলার চাহিদা মিটিয়ে এসব ডিম দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়। তবে উৎপাদন খরচের ঊর্ধ্বগতি ও বাজারদরের অস্থিরতায় এ খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
অন্যদিকে কুড়িগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির কথা স্বীকার করে বলেন, সরকার ফিডের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক হ্রাস এবং বিদ্যুৎ বিলে ভর্তুকির বিষয়টি বিবেচনা করছে। এসব উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে খামারিরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।
একসময় স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ঋণ ও সঞ্চয়ের টাকা বিনিয়োগ করে পোল্ট্রি খামার গড়েছিলেন অনেক উদ্যোক্তা। তাঁদের সেই স্বপ্ন এখন বাড়তি উৎপাদন ব্যয় আর কম বিক্রয়মূল্যের চাপে সংকুচিত হচ্ছে। খামার টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তা, উৎপাদন উপকরণের মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যুৎ বিলে বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে শুধু উদ্যোক্তারাই নন, এ খাতের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক ও তাদের পরিবারও অনিশ্চয়তায় পড়বেন।




