মাগুরা
‘পতাকা আমজেদ’র সাড়ে ৭ কিলোমিটার জার্মান পতাকা

ছবি: আগামীর সময়
ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা কতটা গভীর হতে পারে তার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছেন মাগুরার ঘোড়ামাড়া গ্রামের আমজেদ হোসেন। সবার কাছে তিনি পরিচিত এক নামেই— ‘পতাকা আমজেদ’। বহু বছরের স্বপ্ন, আবেগ আর অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রতীক হয়ে ওঠা তার সাড়ে ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ জার্মানির জাতীয় পতাকাটি এবার তিনি সবার সামনে প্রদর্শন করলেন।
আজ বুধবার সকালে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে ট্রাকে করে বাড়ি থেকে পতাকাটি বের করেন আমজেদ। পরে নিশ্চিন্তপুর হাইস্কুল মাঠে প্রদর্শনের জন্য আনা হলে ভিড় জমে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষের।
এই পতাকার পেছনে রয়েছে এক আবেগঘন গল্প। ২০০৪ সালে এক গোপনীয় দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন আমজেদ। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পরও সুস্থ না হয়ে শেষ পর্যন্ত জার্মানির একটি ওষুধ সেবন করে ২০০৫ সালে সুস্থতা ফিরে পান। সেই থেকেই জার্মানির প্রতি তার মনে জন্ম নেয় গভীর কৃতজ্ঞতা। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ সেই আবেগকে আরও দৃঢ় করে তোলে। এরপর তিনি জার্মানির জাতীয় পতাকা তৈরি শুরু করেন।
প্রথমে পতাকার দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় দেড় কিলোমিটার। ২০১৪ সালে জার্মানি বিশ্বকাপ জয়ের সময় সেটি দাঁড়ায় ৩ কিলোমিটারে। এরপর প্রতিটি বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ধীরে ধীরে পতাকার দৈর্ঘ্য বাড়াতে থাকেন তিনি। আজ সেই পতাকার দৈর্ঘ্য সাড়ে ৭ কিলোমিটার।
নিজের স্বপ্ন পূরণে ৩০ শতক জমি বিক্রি করতে হয়েছে এই পতাকার খরচে। পতাকাটি তৈরি ও সংরক্ষণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। বর্তমানে পতাকাটি নিজের বাড়িতে রাখেন পরম যত্নে। এটি ৮টি বড় অংশে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে। প্রতিটির ওজন এক মণেরও বেশি। নিজের সন্তানের মতোই তিনি আগলে রেখেছেন এই পতাকা।
সংগঠক স্বাধীন শরীফ জানালেন, আমজাদের পতাকাটি অনেক বড়। এত বড় পতাকা সারা দেশে আছে কিনা বলতে পারছি না। তবে বড় পতাকা বানানো আমজাদের পাগলামি নয়। এটি ফুটবলের প্রতি একজন অন্ধভক্ত মানুষের নিখাদ ভালোবাসার প্রতীক।
স্থানীয় শারমীন সুলতানা নামে এক নারী জানান, আমজাদ চাচার এই পাগলামি আমোদের ভালো লাগে। প্রতিবার ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হলে তার পাগলামি মনে করিয়ে দেয় ফুটবলের প্রতি উন্মাদনা, ভালোবাসা।
এ বিষয়ে আমজাদ হোসেনের ভাষ্য, ২০১৪ সালে বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত মাগুরায় এসে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাকে জার্মান ফ্যান ক্লাবের সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দেন। ২০১৮ সালেও জার্মান রাষ্ট্রদূত তার বাড়িতে যান। কিছুদিন সম্মানি পেলেও ২০২১ সালের পর সেই সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়। তবে ভালোবাসা থামেনি।
আজ ৭৮ বছর বয়সেও তার একটাই ইচ্ছা— এই পতাকাটি জার্মান সরকারের কাছে তুলে দেওয়া। যেন তা কোনো জাদুঘরে সংরক্ষিত থাকে। আমজেদের বিশ্বাস, ভালোবাসা কখনও মাপা যায় না। তবু তিনি যেন সেই ভালোবাসাকেই সাড়ে ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এক পতাকার ভাঁজে ভাঁজে বুনে রেখেছেন।
মাগুরার ‘পতাকা আমজেদ’ তাই শুধু একজন ফুটবল সমর্থকের নাম নয়; তিনি আবেগ, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে দাড়িয়েছেন স্থানীয়দের কাছে।




