সুন্দরগঞ্জে অ্যানথ্রাক্স-জলাতঙ্কের দাপট, বাড়ছে উদ্বেগ

ছবি: আগামীর সময়
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। সম্প্রতি লোকালয়ে ঢুকে শিয়ালের কামড়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ নয়জন আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, অসুস্থ গরু জবাই ও মাংস কাটাকাটির পর ৪১ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। এতে এলাকায় প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে রোগ সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে একটি বেওয়ারিশ কুকুরের কামড়ে ২১ জন আহত হওয়ার পর তাদের মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। পরপর এসব ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রাণীজনিত রোগ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শিয়ালের কামড়ে ৯ জন আহত, পরীক্ষায় র্যাবিস
সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের তালুক বেলকা ও জিগাবাড়ী এলাকায় লোকালয়ে ঢুকে পড়ে একটি শিয়াল। কিছুক্ষণের মধ্যেই শিয়ালটি নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ৯ জনকে কামড়ে আহত করে। এ সময় দুটি গবাদিপশুকেও আক্রমণ করে। পরে স্থানীয়রা শিয়ালটিকে পিটিয়ে হত্যা করেন।
প্রাণিসম্পদ ও উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শিয়ালের কামড়ে আহত ৯ জনকেই র্যাবিস প্রতিরোধী ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। তাদের চিকিৎসার পাশাপাশি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
শিয়ালটি মারা যাওয়ার পর এর মাথা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। পরীক্ষাগারের তথ্য অনুযায়ী, শিয়ালটির শরীরে র্যাবিস ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
কুকুরের পর শিয়ালেও জলাতঙ্কের ঝুঁকি
সুন্দরগঞ্জে জলাতঙ্কের ঝুঁকি অবশ্য নতুন নয়। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে উপজেলার কঞ্চিবাড়ী এলাকায় একটি বেওয়ারিশ কুকুরের কামড়ে ২১ জন আহত হন। পরে আহতদের মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
একটি প্রাণীর আক্রমণে একসঙ্গে এত মানুষের আহত হওয়া এবং পরবর্তী সময়ে মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কয়েক মাসের ব্যবধানে আবার শিয়ালের আক্রমণ এবং পরীক্ষায় র্যাবিস শনাক্ত হওয়ার ঘটনায় একই ধরনের ঝুঁকি নতুন করে সামনে এসেছে।
অসুস্থ গরু জবাই, ৪৩ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্স
জলাতঙ্কের পাশাপাশি সুন্দরগঞ্জে এবার অ্যানথ্রাক্স নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের বাছহাটী এলাকায় ১১ সেপ্টেম্বর একটি গরু অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে গরুটি জবাই করা হয়। স্থানীয়রা গরুটির মাংস প্রায় ১০০ ভাগে ভাগ করে নেন।
গরু জবাইয়ের চার দিন পর মাংস কাটাকাটিতে অংশ নেওয়া কয়েকজনের জ্বর ও শরীরে ফোসকা দেখা দেয়। পরে একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে আরও মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন।
প্রথম পর্যায়ে বাছহাটী এলাকায় অসুস্থ গরুর মাংস কাটাকাটিতে জড়িত ২৪ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দেয়। পরে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়ে। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে তারাপুর, কঞ্চিবাড়ি, সোনারায় এবং রামজীবন ইউনিয়নেও অ্যানথ্রাক্স রোগী পাওয়া গেছে। সবমিলিয়ে এ পর্যন্ত অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৪৩ জনে ছাড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নেওয়া মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৩ জনে। তাদের মধ্যে ছয়জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে ৩৬ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অসুস্থ গরুর মাংস কাটাকাটির পর যাদের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দিয়েছে, তাদের জরুরি চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
এদের মধ্যে নারী ১৯ জন, শিশু ৪ জন এবং ১৪ জন পুরুষ। তাদের সবার শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ পাওয়া গেছে এবং সবাইকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি অসুস্থ গরুর মাংসের নমুনা পরীক্ষার জন্য রোগ অনুসন্ধান বিভাগে পাঠানো হয়।
পরীক্ষাগারের তথ্য অনুযায়ী, জবাই করা গরুর মাংসে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ফলে উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন সবাই অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত।
এর আগে গাইবান্ধার সিভিল সার্জন ডা. রফিকুজ্জামানের নেতৃত্বে চিকিৎসক দল আহতদের বাড়িতে গিয়ে তাদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, আক্রান্তদের চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে, সুন্দরগঞ্জে প্রাণিজনিত রোগ পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এবং এপিডেমিওলজি সেলের প্রতিনিধি দল। বুধবার প্রতিনিধি দলটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন।
ঘটনার প্রকৃত কারণ ও রোগের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সেন্ট্রাল ডিজিজ ইনভেস্টিগেশন ল্যাবরেটরিতে শিয়ালের মাথা ও অসুস্থ গরুর মাংসের নমুনা পাঠানো হয়। পরীক্ষার পর ল্যাব থেকে পাওয়া প্রতিবেদনে শিয়ালের নমুনায় জলাতঙ্ক এবং অসুস্থ গরুর মাংসের নমুনায় অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু শনাক্ত হয়েছে।
একই ঘটনা ঘটছে বারবার
সুন্দরগঞ্জে অসুস্থ পশু জবাইয়ের পর মানুষের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দেওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। চলতি সেপ্টেম্বরের শুরুতেও উপজেলার একটি অসুস্থ গরু জবাইয়ের পর কয়েকজনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দেয়।
তখন উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানিয়েছিল, গরুটি জবাই করার পর তারা ঘটনাটি জানতে পারে। এলাকায় গবাদিপশুর টিকাদান কার্যক্রমও চলছিল। উপজেলা প্রশাসন পরীক্ষা ছাড়া অসুস্থ গরু জবাই না করার বিষয়ে কসাইদের সঙ্গে আলোচনা করার উদ্যোগ নেয়।
এর পরপরই আবার বাছহাটী এলাকায় অসুস্থ গরু জবাই এবং বহু মানুষের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দেওয়ায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সে প্রশ্ন সামনে এসেছে।
২০২৫ সালেও ছিল অ্যানথ্রাক্সের ঘটনা
গত বছরও সুন্দরগঞ্জে অসুস্থ গবাদিপশু জবাইয়ের সঙ্গে মানুষের অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা ঘটে। বেলকা ইউনিয়নের কিশামত সদর এলাকায় অসুস্থ গরু জবাইয়ের পর মাংস কাটাকাটিতে অংশ নেওয়া ১১ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দেয় বলে সে সময়ের সংবাদ প্রতিবেদনে জানানো হয়।
একই সময় সুন্দরগঞ্জ পৌর এলাকার আরেকটি ঘটনাতেও অসুস্থ গরু জবাই ও মাংস কাটাকাটির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের শরীরে ফোসকার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরেও অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন এক নারীর মৃত্যুর ঘটনা আলোচনায় আসে। তিনি অসুস্থ ছাগল জবাই করে মাংস কাটাকাটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
টিকা ও জনবল সংকট
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর জানায়, সুন্দরগঞ্জে মোট ২ লাখ ৫৪ হাজার গবাদিপশু রয়েছে। আক্রান্ত এলাকার তিন কিলোমিটারের ১০০ গবাদিপশুকে ভ্যাকসিন দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৪৫ হাজার গরুর টিকা প্রয়োজন হলেও পাওয়া গেছে মাত্র ৩০ হাজার। টিকার ঘাটতির পাশাপাশি জনবল সংকটে দ্রুত সব গরুকে টিকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ।
খামারিদের অভিযোগ, গত বছরও অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব হয়েছিল। সেসময় বেশকিছু গরু মারা যায়। অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত হন অসংখ্য মানুষ। আগাম প্রস্তুতি ও সময়মতো টিকা না দেওয়ায় এবারও পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কে এম ইফতেখারুল ইসলাম জানালেন, পরীক্ষায় গরুর মাংসে অ্যানথ্রাক্স এবং শিয়ালের মাথায় জলাতঙ্কের জীবাণু পাওয়া গেছে। পরীক্ষার ফল অনুযায়ী আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, অসুস্থ গরু কোনোভাবেই জবাই করা উচিত নয়। কোনো পশু অসুস্থ হলে প্রথমে প্রাণিসম্পদ বিভাগকে জানিয়ে পরীক্ষা করাতে হবে। রোগ শনাক্ত হওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অসুস্থ পশুর মাংস মানুষের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পশু অসুস্থ হলে জবাই না করে দ্রুত প্রাণিসম্পদ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। পাশাপাশি কোনো প্রাণীর কামড়ে কেউ আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় এনে র্যাবিস প্রতিরোধী ভ্যাকসিন নিশ্চিত করতে হবে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কামরুল হাসান ভাষ্য, উপসর্গ দেখে প্রথমে অ্যানথ্রাক্সের সন্দেহ করা হয়েছিল। পরে রোগটি নিশ্চিত করতে নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। পরীক্ষার ফলাফলে গরুর মাংসে অ্যানথ্রাক্সের জীবানু পাওয়া গেছে।
তিনি জানান, আক্রান্ত ব্যক্তিরা অসুস্থ গরু জবাই ও মাংস কাটাকাটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তাঁদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং স্বাস্থ্য বিভাগের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।






