মেহেরপুরে আতঙ্ক বাড়াচ্ছে অ্যানথ্রাক্স

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মেহেরপুরে দিন দিন বাড়ছে অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। প্রথমে গবাদি পশু আক্রান্ত হচ্ছে, পরে আক্রান্ত পশুর মাংস খেয়ে কিংবা কাটাকাটির সময় সংস্পর্শে এসে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষ।
এদিকে রংপুর অঞ্চলে অ্যানথ্রাক্স আতঙ্ক বিরাজ করছে। চলতি বছর রংপুরের পীরগাছায় ১১ জনের নমুনা পরীক্ষা করে তিনজনের দেহে অ্যানথ্রাক্স রোগের সংক্রমণ পাওয়া গেছে। মেহেরপুরে বছরের পর বছর রোগটির প্রাদুর্ভাব থাকলেও নেই নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ও পর্যাপ্ত সচেতনতামূলক কার্যক্রম। ফলে দিন দিন বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। শরীরে দগদগে ক্ষত নিয়ে অনেকেই ভুগছেন দীর্ঘদিন।
মেহেরপুরে প্রথম অ্যানথ্রাক্স রোগী শনাক্ত হয় ২০০৭ সালে। গাংনী উপজেলার কাজিপুর গ্রামে প্রথম অ্যানথ্রাক্স দেখা দিলেও ধীরে ধীরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে রোগটি। এখন উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের নারী ও পুরুষ— এমনকি শিশুদের শরীরেও দেখা যাচ্ছে অ্যানথ্রাক্সের ক্ষত।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই দশকে গাংনীর বিভিন্ন গ্রামে সাত হাজার মানুষ অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছেন। জেলায় এ রোগে মৃত্যুর ঘটনা না ঘটলেও অনেক রোগীকে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষত ও যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হয়েছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে দগদগে ক্ষত। ক্ষত যত বড় হচ্ছে, বাড়ছে যন্ত্রণাও। চিকিৎসা নিয়েও পুরোপুরি স্বস্তি মিলছে না অনেকের। অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত এসব মানুষ এখন আতঙ্ক আর অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
চলতি বছরের চিত্র আরও উদ্বেগের। গত চার মাসে অ্যানথ্রাক্স সন্দেহে ৫৫ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পাঠানো হয় আইইডিসিআরে। এর মধ্যে ৪৫ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু শনাক্ত হয়েছে। আর চলতি বছরের ৯ মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৬২ জনে। পাশাপাশি দুই শতাধিক গবাদি পশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।
গাংনীর সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতেই এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এ ছাড়া বাওট, কাজিপুর, মটমুড়া, সাহারবাটি ও বামন্দী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে দেখা যাচ্ছে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ।
রোগটি মূলত গবাদি পশু থেকে মানুষের শরীরে ছড়ায়। আক্রান্ত গরু-ছাগল জবাই করে কম দামে মাংস বিক্রি করায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে। পশু জবাই, মাংস কাটা কিংবা রান্নার সময় যথাযথ সতর্কতা না থাকায় জীবাণুর সংস্পর্শে আসছেন মানুষ।
অ্যানথ্রাক্সের বিস্তার ঠেকাতে এরই মধ্যে গাংনীতে কাজ শুরু করেছে জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান— আইইডিসিআরের একটি দল। সন্দেহভাজন রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করে পাঠানো হচ্ছে পরীক্ষার জন্য। পাশাপাশি কী ধরনের অ্যানথ্রাক্স তা নির্ণয় করে আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
গাংনী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আরিফুল ইসলাম জানালেন, গাংনী দীর্ঘদিন ধরেই অ্যানথ্রাক্সপ্রবণ এলাকা। বিশেষ ব্যবস্থায় টিকাদান কার্যক্রম চলমান। এরই মধ্যে ৩০ হাজার পশুকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে।
মেহেরপুর সিভিল সার্জন আবু সাঈদ জানিয়েছেন, অ্যানথ্রাক্সের ভয়াবহতা, সংক্রমণের ঝুঁকি এবং প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে উদ্যোগ নিয়েছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে, মাংস কেনাবেচার সময় অবশ্যই মানুষকে সচেতন হতে হবে, একই সঙ্গে মাংস কাটাকাটির সময় হাতে গ্লাভস ব্যবহার জরুরি।
রংপুরের পীরগাছায় চলতি বছর মানুষের শরীরে অ্যানথ্রাক্স রোগের সংক্রমণ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ৩১ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ রয়েছে।
চলতি মাসের ২ তারিখে পীরগাছা উপজেলার ছাওলা ইউনিয়নের আদমপাড়া এলাকায় সুমন মিয়াসহ তার পরিবারের তিনজনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দেয়। এরপর সেখানকার ১১ জনের নমুনা পরীক্ষা করে তিনজনের দেহে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু পাওয়া যায়। পরে পার্বতীপুর সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে তারা সুস্থ হয়েছেন। এ ঘটনায় আইইডিসিআরের ছয় সদস্যের একটি দল ঘটনাস্থলে এসে সেখানকার মাটিসহ অন্যান্য নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে যান।
উপসর্গ থাকা পীরগাছার ছাওলা ইউনিয়নের আদমপাড়া গ্রামের আবু তালেব ও আনোয়ারা বেগম বলেছেন, ‘নমুনা পরীক্ষায় নেগেটিভ এসেছে। তারপরও আতঙ্ক কাজ করছে।’
রংপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মুহ. নাজমুল হুদা জানিয়েছেন, অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে গবাদি পশুকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অ্যানথ্রাক্স সচেতনায় সাধারণ মানুষসহ খামারিদের মধ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. ওয়াজেদ আলী বললেন, এ বছর সবচেয়ে বেশি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ৩১ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ রয়েছে। রংপুর, গাইবান্ধা ও দিনাজপুরে সন্দেহভাজন ৪৫ জন রয়েছেন। যদিও গত বছর এ সংখ্যা ছিল ১০৪ জন। অ্যানথ্রাক্স সচেতনতায় বিভাগ জুড়ে মেডিকেল টিম কাজ করছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।



