বাড়ছে ট্রেন, সেবা বাড়বে কি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজস্ব ঘাটতি ও জনবল সংকটের যুক্তি দেখিয়ে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে যুক্ত হচ্ছে আরও ১১টি মেইল এবং লোকাল ট্রেন। এ লক্ষ্যে এরই মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ে সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে একটি প্রস্তাব। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দাবি, এর মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়বে এবং উন্নত হবে সেবার মান। তবে যাত্রী, নাগরিক সমাজ ও রেলসংশ্লিষ্টদের একাংশের আশঙ্কা, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং তদারকির সংকট সমাধান না করে বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়ানো হলে শেষ পর্যন্ত এর আর্থিক চাপ এসে পড়বে সাধারণ যাত্রীদের ওপরই।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের ২৪টি মেইল, বেসরকারি অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে কমিউটার ও লোকাল ট্রেন। এসব ট্রেন থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা আয় করছে রেলওয়ে। এবার একই ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে আরও ১১টি ট্রেন। এই ব্যবস্থায় রেললাইন, ইঞ্জিন ও কোচের মালিকানা থাকে রেলওয়ের কাছেই। তবে টিকিট পরীক্ষা, যাত্রীসেবা, পরিচ্ছন্নতা এবং ট্রেনে যাত্রী ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ফরিদ আহমেদ বললেন, ‘এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদনের অপেক্ষায় আছি।’
রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, জনবল সংকটের কারণে সব মেইল ও লোকাল ট্রেনে কার্যকরভাবে টিকিট পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক (সিসিএম) মো. আহসান উল্লাহ ভূঁইয়া বললেন, ‘উদ্যোগটির মূল লক্ষ্য রাজস্ব বৃদ্ধি এবং সেবার মান উন্নয়ন। সব ট্রেনের আয়-ব্যয়ের হিসাব একসঙ্গে করা হয়। কোন ট্রেন বছরে কতটা লোকসান করছে, এর আলাদা হিসাব নেই। তবে টিকিটবিহীন যাত্রা ও পর্যাপ্ত তদারকির অভাবে রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।’
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের আর্থিক সংকট শুধু জনবল ঘাটতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বছরের পর বছর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থতা, টিকিটবিহীন যাত্রা, দুর্বল তদারকি এবং ব্যবস্থাপনাগত নানা সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ছিল ১ হাজার ৩৭৭ কোটি ৫ লাখ টাকা; কিন্তু আয় হয়েছে মাত্র ৬৪৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। একই সময়ে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের লক্ষ্য ছিল ৩ কোটি ৭৬ লাখ, বাস্তবে পরিবহন করা হয়েছে ২ কোটি ৪৪ লাখ।
২০২৪-২৫ অর্থবছরেও লক্ষ্য ও অর্জনের মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা গেছে। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ১৫৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। অথচ আয় হয়েছে ৬২১ কোটি ৩১ লাখ টাকা। যাত্রী ও পণ্য পরিবহন হয়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ, যেখানে লক্ষ্য ছিল ৩ কোটি ১৫ লাখ।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেও একই চিত্র। ৮২৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয় হয়েছে ৫৬৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। যাত্রী পরিবহন হয়েছে ২ কোটি ১৩ লাখ, যা নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়ে কম।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায় হচ্ছে অনেক কম। অথচ সংকটের পেছনে থাকা কারণগুলো নিরসনে দেখা যাচ্ছে না দৃশ্যমান কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন।
রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, পশ্চিমাঞ্চলের মাত্র ১০ থেকে ১২টি ট্রেন নিয়মিত মুনাফা করছে। এর মধ্যে ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং রাজশাহী-খুলনা রুটের আন্তঃনগর ট্রেনগুলো সবচেয়ে লাভজনক। বিপরীতে অধিকাংশ মেইল ও লোকাল ট্রেন কম ভাড়া, পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি এবং টিকিটবিহীন যাত্রার কারণে লোকসানে চলছে।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, টিকিট না কেটে যাতায়াত করেন অনেক যাত্রী। কেউ কেউ নির্ধারিত টিকিট কেনার পরিবর্তে ট্রেনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু কর্মীর কাছে অনানুষ্ঠানিকভাবে টাকা দিয়ে যাত্রা করেন। ফলে সরকারি রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রকৃত আয়-ব্যয়ের হিসাবও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এ বিষয়ে রেলওয়ের অতিরিক্ত প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক (পশ্চিমাঞ্চল) মো. আনসার আলী বললেন, ‘বিশেষ করে লোকাল ও মেইল ট্রেনে অনেক যাত্রী টিকিট কিনতে চান না। রাজস্ব কম হওয়ার এটিও একটি বড় কারণ।’
‘অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগের ব্যয় অনেক ক্ষেত্রে ওই ট্রেনগুলোর আয়কেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। সেই তুলনায় বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়া আর্থিকভাবে বেশি সুবিধাজনক’— যোগ করেন তিনি।
তবে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা প্রশ্ন তুলেছেন, সমস্যার মূল কারণ সমাধান না করে বেসরকারি ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর যৌক্তিকতা নেই। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতি আহমেদ সফিউদ্দিন বললেন, ‘যদি উদ্দেশ্য হয় কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যবসার সুযোগ তৈরি করা, তাহলে বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। আমাদের দেশে বেসরকারীকরণের পর সাধারণ মানুষের ব্যয় বাড়ার বহু উদাহরণ রয়েছে। যদি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেন পরিচালনা করে লাভ করতে পারে এবং সরকারকে লিজ ফিও দিতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ রেলওয়ে নিজে কেন তা পারবে না— এই প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।’




