হারিয়ে যাওয়ার পথে মৃৎশিল্প, পেশা বদলাচ্ছেন কুমাররা

অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে কয়েক প্রজন্মের পুরানো মৃৎশিল্প। ছবি: আগামীর সময়
একসময় সকাল হলেই কুড়িগ্রামের রাজারহাটের সোমনারায়ণ পালপাড়ায় শুরু হতো মাটির সামগ্রী তৈরির ব্যস্ততা। পরিবারের নারী-পুরুষ সবাই মিলে তৈরি করতেন হাঁড়ি-পাতিল, কলসি, বাসনপত্রসহ নানা পণ্য। এসব বিক্রি করেই চলত সংসার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম ও লোহার পণ্যের দাপটে কমেছে মাটির সামগ্রীর চাহিদা। জীবিকার তাগিদে বংশপরম্পরার পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যুক্ত হচ্ছেন নতুন প্রজন্মের সদস্যরা। একসময় যে পেশার ওপর নির্ভরশীল ছিল গ্রামের ৩০টি পরিবার, সেখানে এখন নিয়মিত কাজ করছেন মাত্র ছয়টি পরিবারের ১৩ জন। অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে কয়েক প্রজন্মের পুরনো এই মৃৎশিল্প।
প্রায় ২৫ বছর আগেও মৃৎশিল্পের বেশ সমৃদ্ধি ছিল সোমনারায়ণ পালপাড়া। এ পেশায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন গ্রামের ৩০টি পরিবারের ৬০ থেকে ৭০ জন সদস্য। কেউ বিভিন্ন স্থান থেকে মাটি সংগ্রহ করতেন, কেউ তা বাছাই করে প্রস্তুত করতেন, আবার কেউ তৈরি পণ্য বাজারে নিয়ে বিক্রি করতেন। দাদার কাছ থেকে বাবা, বাবার কাছ থেকে ছেলে এবং প্রবীণদের কাছ থেকে নতুন প্রজন্ম শিখত মাটির সামগ্রী তৈরির কৌশল। এভাবেই বংশপরম্পরায় টিকে ছিল পেশাটি।
রাজারহাটের এই কুমারদের মৃৎশিল্প তৈরির পদ্ধতিও কিছুটা আলাদা। প্রচলিত মাটির চাকার পরিবর্তে হাতের নিপুণতা, বিভিন্ন ছাঁচ ও পাথরের আঘাতে তৈরি করা হয় নানা ধরনের সামগ্রী। প্রথমে মাটি কেটে বাছাই করে তাতে বালু মিশিয়ে তৈরি করা হয় ‘ডো’। এরপর কয়েকটি ধাপে হাত ও ছাঁচের সাহায্যে দেওয়া হয় কাঙ্ক্ষিত আকার। একটি সামগ্রী তৈরি করতে সময় লাগে তিন থেকে চার দিন। পরে রোদে শুকিয়ে খড়ি ও কাঠের গুঁড়া দিয়ে পোড়ানো হয় চুল্লিতে। সবশেষে রঙ করে বিক্রির উপযোগী করা হয় পণ্যগুলো। দীর্ঘ এই প্রক্রিয়ায় পরিবারের একাধিক সদস্যের শ্রম যুক্ত থাকে।
একসময় ব্যাপক চাহিদা ছিল মাটির হাঁড়ি, পাতিল, কলসি ও বাসনপত্রের। রান্না, পানি সংরক্ষণসহ গৃহস্থালির নানা কাজে ব্যবহৃত হতো এসব সামগ্রী। কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে জায়গা করে নিয়েছে প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম ও লোহার তৈরি পণ্য। সহজলভ্যতা ও ব্যবহারের সুবিধার কারণে এসব পণ্যের দিকে ঝুঁকেছেন ক্রেতারা। ফলে বাজার হারিয়েছে মাটির সামগ্রী। চাহিদা কমে যাওয়ায় এখন ১০ থেকে ১৫ ধরনের পণ্য তৈরি বন্ধ করে দিয়েছেন কুমাররা।
৬০ বছর বয়সী কুমার সুবল চন্দ্র পালের কথায় উঠে এসেছে এই পরিবর্তনের চিত্র। তার ভাষ্য, ‘হামার ব্যবসা প্লাস্টিকে শ্যাষ করছে। প্লাস্টিক দিয়া এলা সব বানায়, মাটির জিনিস চলে ক্যামন করি। কলসি চলছিল, এলা চলে না। আগে মসজিদে বাসন ছিল, এলা চলে না। ১০-১৫ প্রকার জিনিস এলা আর বানাইয়ে না।’
বাজার সংকুচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কমেছে এ পেশায় যুক্ত পরিবারের সংখ্যাও। বর্তমানে নিয়মিত মাটির সামগ্রী তৈরি করছেন সুবল চন্দ্র পাল, অধীর চন্দ্র, স্বপন চন্দ্র পাল, সুজন চন্দ্র পাল, মাখন পাল ও ব্রজেন পালের পরিবার। ছয় পরিবারের মোট ১৩ জন নারী-পুরুষ এ কাজের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে, অনেকেই জীবিকার তাগিদে পেশা বদল করেছেন। কেউ চাকরি করছেন, কেউ বেছে নিয়েছেন অন্য কাজ।
যারা এখনো এ পেশায় আছেন, তাদের অনেকের কাছে মৃৎশিল্প শুধু জীবিকা নয়, পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ। তাই আয় কমে গেলেও পূর্বপুরুষের পেশা ছাড়তে চান না তারা। কুমার মাখন পাল বললেন, ‘চৌদ্দগুষ্টি হাতেই হামরা এই ব্যবসায় করি, এটা বাদে কিছু করিবার পাইনা। এই কাম মোর বাপ করছে, এখন মুই করবার নাগছোং।’
কুমার ব্রজেন পালের ভাষ্য, ‘বাপদাদার দেওয়া এই কাম ছাইড়বার পাং না। আগে অনেক মাইষে এই কাম করি প্যাট চালাইছে। এলা এই কমোত পাইসা কম, ওমরা অন্য কাম করি খায়। মুই কখনো এই কাম ছাড়ার চিন্তা করোং নাই, যতদিন বাঁচি আছোং এই কাম করিয়ায় খাইম।’
তবে সারা বছর মাটির সামগ্রী তৈরি করে সংসার চালানোর সুযোগ এখন আর আগের মতো নেই। মেলা, পূজা-পার্বণ ও বিশেষ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে কিছুটা কাজের সুযোগ তৈরি হয়। এ সময় নিয়মিত ছয়টি পরিবারের বাইরেও আরও প্রায় ১৫ জন কুমার মৌসুমি ভিত্তিতে কাজে যুক্ত হন। তারা খেলনা, পূজার সামগ্রী, বর্ষাকালে জালের কাঠি, পুতুল, চুলা, ফুলের টব, মাটির ব্যাংক ও গরুর পানি খাওয়ানোর চারি তৈরি করেন। এসব পণ্য বিক্রি করে মৌসুমভিত্তিক কিছু আয় হয়। তবে তা দিয়ে সারা বছরের সংসার চালানো কঠিন বলে জানিয়েছেন কুমার রতন পাল।
কুমার মদন পালের স্ত্রী বাসন্তী পাল জানান, গরুর পানি খাওয়ানোর চারি আকারভেদে ১০০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হয়। হাতি আকৃতির মাটির ব্যাংক ১০০ থেকে ১২০ টাকা, কুমড়ার আকৃতির ব্যাংক ৮০ টাকা এবং ঘোড়ার আকৃতির ব্যাংক ৫০ টাকায় বিক্রি করা হয়। তবে এসব পণ্যের চাহিদাও সারা বছর সমান থাকে না। ফলে কাজের সুযোগ ও আয় দুটোই সীমিত।
মৃৎশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে নতুন প্রজন্মের পেশা পরিবর্তনকে ঘিরে। একসময় বাবার হাত ধরে সন্তানেরা এ কাজ শিখতেন। এখন তাদের অনেকেই আর মৃৎশিল্পে যুক্ত হতে চান না। ব্রজেন পালের দুই ছেলে জয়ন্ত কুমার পাল ও নারায়ণ চন্দ্র পালও বেছে নিয়েছেন ভিন্ন পেশা। পড়াশোনা শেষে জয়ন্ত গবাদিপশুর চিকিৎসক হয়েছেন। অন্যদিকে নারায়ণ ঢাকায় একটি কোম্পানিতে চাকরি করছেন। তাদের মতো পালপাড়ার অধিকাংশ পরিবারের সন্তানরাই এখন আর বংশপরম্পরার এই পেশায় ফিরতে আগ্রহী নন।
নারায়ণ চন্দ্র পাল বলেছেন, ‘আমাদের বাপদাদারা এই কাজ করেছে। তখন এই পেশার মূল্যায়ন ছিল এবং এই কাজেও অর্থ ছিল। কিন্তু এখন এই কাজে পরিশ্রমের তুলনায় অর্থ খুবই কম। এই কাজে যে অর্থ আসে, তা দিয়ে একটি সংসার চালানো খুবই কষ্টকর। এজন্য আমরা আর এই পেশায় গিয়ে নিজেদের ছেলেমেয়েকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিতে চাই না। তাই আমরা এই পেশা থেকে সরে এসেছি।’
বাবা-মায়ের কাজের প্রতিটি ধাপ কাছ থেকে দেখেছেন জয়ন্ত কুমার পাল। তার ভাষ্য, ‘আমার বাবা বিভিন্ন জায়গা থেকে মাটি সংগ্রহ করেন। সেই মাটি বাছাই করে প্রস্তুত করে দেন আমার মাকে। আমার মা মাটি দিয়ে তিন-চার ধাপে একটি হাঁড়ি বা অন্যান্য জিনিস তৈরি করেন। এতে প্রায় তিন-চার দিন সময় লাগে। শেষ পর্যন্ত একটি হাঁড়ি বা অন্য কোনো সামগ্রী তৈরি করে সর্বনিম্ন দুই টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৬০ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। এত পরিশ্রমের পর আমার বাবা সাইকেলে করে এসব জিনিস হাটে নিয়ে বিক্রি করেন। তারপর তারা সামান্য কিছু টাকা আয় করেন। এখন এই পেশায় যে কষ্ট ও পরিশ্রম করতে হয়, অন্য কোনো পেশায় একই পরিমাণ পরিশ্রম করলে বেশি টাকা আয় করা সম্ভব।’
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) কুড়িগ্রাম জেলা শাখার উপব্যবস্থাপক শাহ মোহাম্মদ জোনায়েদ জানিয়েছেন, কুমারদের তৈরি পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রির জন্য বিভিন্ন মেলার আয়োজন করে বিসিক। এসব মেলায় তাদের বিনা মূল্যে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়। রাজারহাটের পেশাদার কুমারদের তালিকা তৈরি করে তাদের সহায়তার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।






