বৈঠার ছন্দে ফিরল সোনালি দিন, মুখর কুমারখালীর বহলবাড়িয়া বিল

দর্শকদের করতালি ও জারি গানের ধ্বনিতে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে বহলবাড়িয়া বিল এলাকা। ছবি: আগামীর সময়
ঢোলের আওয়াজ আর পানিতে বৈঠার ছন্দে শনিবার বিকালে মুখর হয়ে উঠেছিল কুষ্টিয়ার কুমারখালীর পুরাতন চড়াইকোলের বহলবাড়িয়া বিল। প্রায় চার দশকের ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ দেখতে কুষ্টিয়ার বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসেন ১০ থেকে ১১ হাজার মানুষ। বিলের দুই পাড় ও আশপাশের গ্রামীণ সড়কে নামে মানুষের ঢল।
বিকাল গড়াতেই শুরু হয় প্রতিযোগিতা। বাহারি রঙের ডিঙি নৌকায় মাথা ও কোমরে রঙিন গামছা, একই রঙের গেঞ্জি পরে বৈঠা হাতে নেন মাঝিরা। বাঁশির তালে তালে সমন্বিতভাবে বৈঠা চালিয়ে ছুটে চলে নৌকাগুলো। পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকদের করতালি ও জারি গানের ধ্বনিতে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
কুমারখালী সরকারি কলেজের স্নাতক শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী আলিফ হোসেন বলেছেন, ‘নৌকা বাইচ বাঙালির ঐতিহ্য। ছোটবেলায় একবার নৌকা বাইচ দেখেছিলাম। অনেক বছর পর আবার দেখে বেশ ভালো লেগেছে। শহুরে জীবনের ব্যস্ততার বাইরে এমন আয়োজন মানুষকে গ্রামবাংলার চেনা সংস্কৃতির কাছে ফিরিয়ে আনে।’
নৌকা বাইচ তরুণদের পাশাপাশি প্রবীণদেরও ফিরিয়ে নেয় পুরোনো স্মৃতিতে। বুজরুখ বাঁখই গ্রামের বৃদ্ধ আব্দুল মজিদ জানান, একসময় প্রায়ই নৌকা বাইচ হতো। যুবক বয়সে তিনিও বাইচের নৌকার মাঝি হিসেবে অংশ নিয়েছেন। বয়সের কারণে এখন আর অংশ নিতে না পারলেও খেলা দেখতে এসেছেন। দীর্ঘদিন পর বাইচ দেখে পুরোনো অনেক স্মৃতি মনে পড়েছে তার।
প্রতিযোগী নৌকা ‘ময়ূর’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আল মামুন জানান, ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচে অংশ নিতে তিনি ঢাকা থেকে এসেছেন। দুই দিন ধরে পরিশ্রম করে নৌকাটি সাজিয়েছেন। বিপুলসংখ্যক দর্শকের উপস্থিতি তাকে আনন্দিত করেছে। ভবিষ্যতেও এমন আয়োজন অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
নদী ও বিল ভরাট এবং আধুনিক বিনোদনের বিস্তারে একসময় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তবে বহলবাড়িয়া বিলের এই আয়োজন দেখিয়েছে, মানুষের আগ্রহ ও ভালোবাসা থাকলে পুরোনো ঐতিহ্য আবারও প্রাণ ফিরে পেতে পারে।
আয়োজক কমিটির সদস্যসচিব ওয়াশিম আকরাম জানান, টানা ৩৯ বছর ধরে নৌকা বাইচের আয়োজন করা হচ্ছে। তরুণদের খেলাধুলা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত রাখা এবং মাদক থেকে দূরে রাখাই এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। এবার মানুষের ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে নৌকা বাইচ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শেখ সাদী বললেন, নৌকা বাইচ শুধু একটি খেলা নয়, এটি গ্রামবাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মানুষের মিলনমেলা। এমন আয়োজন পুরো জেলায় ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন।









