ভয় কাটছে না তিস্তা পাড়ের রাহেদাদের

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘হামার বাড়ি গতবার নিয়া সাতবার ভাঙছি, যে একনা জমি ছিল তাও এলা নদীর পেটত। ধার-দেনা করি মাইষের জাগাত বাড়ি করছি। এলাতাও যদি নদী নিয়া যায় হামরা কোনটে যামো। হামরা চাই এটে সরকার বাঁধ বান্ধি দেউক।’ কথাগুলো বলছিলেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের রামগতি এলাকার ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা রাহেদা খাতুন। তিস্তার করাল গ্রাসে তিনি ভিটেমাটি হারিয়েছেন এখন পর্যন্ত সাতবার। তার কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ। নদীপাড়ে বসে তিনি প্রতিবেদকের কাছে জানতে চাইলেন— কবে সরকার সেখানে স্থায়ী বাঁধ দেবে? রাহেদার ভাষ্য, ‘শুনছি এবার বান আসপে। ভারত বলে নদী খুলি দিছে। এলাই নদীর যে ডাক। আল্লাহয় জানে কপালোত কী আছে!’
রাহেদার সঙ্গে কথা বলতে বলতে প্রতিবেদককে সরকারি লোক ভেবে ছুটে আসেন আবিয়া খাতুন (৬৫)। আবেদন জানান তার নামও লিখে নেওয়ার জন্য। বিধবা আবিয়া খাতুন জানালেন, তার এক ছেলে ঢাকায় থাকে। তিনি বউকে নিয়ে থাকেন নদী তীরবর্তী এ গ্রামে। ইশারা দিয়ে দেখিয়ে বললেন, ‘ওই চরে হামার বাড়ি ছিল, জমি ছিল কিন্তু সোগে নদী নিয়া গেছে। এলা থাকি এক সাগাইয়ের বাড়িত। নদী যে ডাক ছাড়ছে তাতে এবার যে কপাতল কী আছে কাই জানে।’
শুধু বন্যা নিয়ে এ আতঙ্ক রাহেদা ও আবিয়া খাতুনের নয়। এ আতঙ্ক জেলার তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, দুধকুমার নদের পাড়ের কয়েক লাখ বাসিন্দার। বিশেষ করে, জেলার চারশর বেশি চরের বাসিন্দাও ভুগছেন এই আতঙ্কে। আর তাদের এই আতঙ্ক বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ পরিসংখ্যান। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, আগামী ২৪ ঘণ্টা তিস্তা নদীর অববাহিকায় পানি বৃদ্ধি এবং তার সঙ্গে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ৩টার সবশেষ তথ্য-উপাত্ত বলছে, তিস্তা নদীর কাউনিয়া পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার শূন্য দশমিক ৪৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি আগের দিনের তুলনায় কিছুটা কমেছে। পাটেশ্বরী পয়েন্টে দুধকুমার নদের পানি বিপৎসীমার শূন্য দশমিক ৬৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আর কুড়িগ্রামের ধরলা পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১ দশমিক ১৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যান্য নদ-নদীর পানি স্বাভাবিক পর্যায়ে রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড কুড়িগ্রাম আরও বলছে, জেলার ৩৩টি পয়েন্টে চলছে নদীভাঙন। ১৯ পয়েন্টে জরুরি ভিত্তিতে নদীভাঙন রোধে ফেলা হচ্ছে জিও ব্যাগ।
রব্বানী মিয়া ৬০ বছরের জীবনে বহুবার দেখেছেন তিস্তার করাল গ্রাস। তিনি বললেন, ‘মোর বাড়িঘর জমি সোগে তিস্তা নিয়া গেছে। বন্যা আইসে আর হামরা আল্লাহ আল্লাহ করি। এবার যে কপালত কী আছে কাই জানে!’ তার বক্তব্য পানি উন্নয়ন বোর্ড যে জিও ব্যাগ ফেলে তাতে কোনো কাজ হয় না। নদীভাঙনের কবলে সব চলে যায়। তার দাবি, সরকার যেন খুব দ্রুত তিস্তার ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে দেয়।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানালেন, উজানের ও জেলায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় আগামী কয়েক দিন জেলার নদ-নদীগুলোর, বিশেষ করে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কায়ও রয়েছে। ফলে এ নদী অববাহিকার নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তার ভাষ্য, ‘আমরা আপাতত জিও ব্যাগ ফেলছি জরুরি কাজের আওতায়। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন বাঁধ।’




