ভোট ছাড়াই আট বছর, সংকটে চা শ্রমিক ইউনিয়ন
- আট বছরেও হয়নি চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন
- মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিতেই চলছে সংগঠন, নেতৃত্ব সংকটে চা বাগান
- তিন বছরের কমিটি চলছে আট বছর, আটকে আছে ভোট

সংগৃহীত ছবি
দেশের চা শিল্পে কর্মরত লক্ষাধিক শ্রমিকের অন্যতম প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নির্বাচন আট বছর ধরে অনুষ্ঠিত হয়নি। ২০১৮ সালের ২৪ জুন সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর ভোট হওয়ার কথা ছিল। সে হিসাবে ২০২১ সালেই নতুন কমিটি নির্বাচিত হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন জটিলতায় এখনও নির্বাচন হয়নি। ফলে তিন বছরের জন্য নির্বাচিত কমিটিই টানা আট বছর ধরে সংগঠনের দায়িত্ব পালন করছে। এতে চা শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ, নেতৃত্ব সংকট এবং সাংগঠনিক স্থবিরতা বাড়ছে।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৭৮টি চা বাগান রয়েছে। ইউনিয়নের নিবন্ধিত ভোটার ৯৬ হাজারের বেশি। এসব ভোটারের প্রত্যক্ষ ভোটে পঞ্চায়েত, ভ্যালি ও কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচিত হওয়ার বিধান রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় অনেক বাগানে নির্বাচিত পঞ্চায়েত কমিটির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কোথাও কোথাও পুরোনো কমিটি বিলুপ্ত করে অ্যাডহক কমিটি গঠন করে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
চা শিল্পের অন্যতম বৃহৎ অঞ্চল মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় রয়েছে ৪১টি চা বাগান। উপজেলার বিভিন্ন বাগানে দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় শ্রমিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়েছে। এতে শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরা, অধিকার আদায় এবং মালিকপক্ষের সঙ্গে কার্যকর আলোচনায় জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন শ্রমিকরা।
সরেজমিন উপজেলার জাগছড়া, রাজঘাট, কালিঘাট, মির্জাপুর, বৌলাছড়া, বিলাসছড়া, হরিণছড়া, খেজুরি, মাজদিহিসহ বিভিন্ন চা বাগান ঘুরে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্বাচন না হওয়ায় সংগঠনের ভেতরে বিভাজন ও অসন্তোষ বাড়ছে। নির্বাচিত প্রতিনিধির অভাবে মজুরি, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ বিভিন্ন শ্রমিক কল্যাণমূলক বিষয় যথাযথভাবে মালিকপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শ্রমিক নেতা বললেন, দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় সংগঠনের ভেতরে দলাদলি ও বিভক্তি বেড়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন, উৎপাদনশীলতা এবং বাগানের সামগ্রিক পরিবেশে।
নারী চা শ্রমিক কল্পনা ব্যানার্জী বললেন, আমরা নিয়মিত চাঁদা দিয়ে ইউনিয়ন পরিচালনা করি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ভোট দিয়ে নেতৃত্ব নির্বাচনের সুযোগ পাচ্ছি না। ন্যায্য মজুরি, হাজিরা, বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এবং অবসরে যাওয়া শ্রমিকদের প্রভিডেন্ট ফান্ড নিয়েও নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি না বাড়ায় শ্রমিকদের জীবনযাপন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ভুড়ভুড়িয়া চা বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি সুধীর রিকিয়াশনের ভাষ্য, প্রায় আট বছর আগে সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল। এরপর বহুবার দাবি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। নির্বাচনের মাধ্যমেই শ্রমিকদের মতামত প্রতিফলিত হয় এবং নেতৃত্বের জবাবদিহি নিশ্চিত হয়।
চা শ্রমিক নেতা আকাশ দোষাদের মতে, দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় সংগঠন কার্যত অসুস্থ হয়ে পড়েছে। শ্রমিকদের কথা বলার মতো কার্যকর প্ল্যাটফর্ম নেই। বিভিন্ন অজুহাতে বছরের পর বছর একই নেতৃত্ব বহাল রয়েছে। অনেক বাগানে ২০১৮ সালের নির্বাচিত পঞ্চায়েত কমিটি বিলুপ্ত করে অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরা একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাই।
লাখাইছড়া চা বাগান এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুস সাত্তার বললেন, নেতৃত্বের অভাবে শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে। শ্রমিকদের মধ্যে বিভাজন বাড়ছে এবং তারা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দ্রুত নির্বাচন হলে এ সংকট অনেকটাই দূর হবে।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরীর মতে, নির্বাচন বিলম্বের অন্যতম কারণ গঠনতন্ত্র সংশোধন। আট বছর ধরে কেন্দ্রীয় নির্বাচন না হওয়ায় চা শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা বাড়ছে। অতীতে সরকারের তত্ত্বাবধানে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাই এবারও সরকারের তত্ত্বাবধানেই নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানাচ্ছি। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়ায় চা বাগানগুলোতে গণতান্ত্রিক চর্চা ব্যাহত হচ্ছে, নেতৃত্বের প্রতি শ্রমিকদের আস্থা কমে যাচ্ছে এবং স্থিতিশীল পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা জরুরি।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি পংকজ কন্দ জানান, নির্বাচন বিলম্বের পেছনে শুধু অর্থসংকট নয়, প্রশাসনিক জটিলতাও রয়েছে। অতীতে সরকারের অর্থায়ন ও তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে। এবারও সরকারকে একইভাবে নির্বাচন আয়োজনের অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিষয়টি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
শ্রমকল্যাণ মন্ত্রী, সচিবসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। তারা আমাদের জানিয়েছেন, দ্রুত তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। আমরা আশা করছি, সব জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত তফসিল ঘোষণা হবে। আমরা একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন চাই, বললেন তিনি।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সংস্কার কমিটির আহ্বায়ক বিশু প্রসাদ গোয়ালা বললেন, সাংগঠনিক দুর্বলতা, পরিকল্পনার অভাব এবং দায়িত্বশীলদের অনীহার কারণে সময়মতো নির্বাচন হয়নি। এতে চা শ্রমিকরা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। নিয়মিত নির্বাচন না হওয়ায় সংগঠনের গণতান্ত্রিক চর্চা ও জবাবদিহি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। দ্রুত ইউনিয়নের সব স্তরের নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
খেজুরি চা বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি মহেশ্বর দাস জানালেন, বর্তমান কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় মালিকপক্ষের সঙ্গে কার্যকরভাবে আলোচনা করা যাচ্ছে না। ফলে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ে সমস্যা হচ্ছে। নির্বাচন না হওয়ায় প্রায় প্রতিটি বাগানেই সংকট বাড়ছে এবং সংঘাতের আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান আগামীর সময়কে বললেন, শ্রমিক সংগঠনের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত নির্বাচন হলে শ্রমিকরা তাদের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার সুযোগ পান এবং এতে সংগঠনের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা বাড়ে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুততম সময়ে এ বিষয়ে উদ্যোগী হবে মর্মে আমি আশা করছি। এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।
চা শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন দীর্ঘদিন ঝুলে থাকায় শুধু সাংগঠনিক সংকটই নয়, শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের প্রক্রিয়াও দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাই দ্রুত সব জটিলতা নিরসন করে একটি অংশগ্রহণমূলক, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে চা শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।




