জাতীয় পথশিশু দিবস
ফুটপাতেই হারাচ্ছে শৈশব

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দিনের আলোয় কক্সবাজার শহর থাকে পর্যটকের ভিড়ে মুখর। কলাতলী, সুগন্ধা পয়েন্ট কিংবা লাবণী পয়েন্টে তখন ব্যস্ততা, দোকানের আলো আর সমুদ্র দেখতে আসা মানুষের আনাগোনা। কিন্তু রাত গভীর হলে সামনে আসে একই শহরের অন্য একটি চিত্র। বন্ধ দোকানের শাটারের পাশে, ফুটপাতের কোণে কিংবা রাস্তার ধারে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়ে একদল শিশু। কারও মাথার ওপর ছাদ নেই, পাশে নেই মা-বাবা। একটি পুরনো বস্তা, ছেঁড়া কাপড় কিংবা কার্টনের টুকরোই অনেকের রাতের বিছানা।
সকালে ঘুম ভাঙার পর তাদের সামনে থাকে আরেক অনিশ্চিত দিন। কারও হাতে উঠে আসে বোতল কুড়ানোর বস্তা, কেউ দাঁড়ায় পথচারীদের সামনে হাত পেতে, কেউ ছোটে হোটেল-রেস্তোরাঁয় কাজের খোঁজে। কেউ বাসের হেলপার, কেউ বিক্রি করে চা-সিগারেট। দিন শেষে কত টাকা আয় হবে, আদৌ পেটে খাবার জুটবে কি না, তা জানে না তারা। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের শৈশব।
কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। কলাতলী মোড়, সুগন্ধা পয়েন্ট, লাবণী পয়েন্টসহ ব্যস্ত এলাকাগুলোয় দিনের বড় সময় কাটায় পথশিশুরা। খাবারের নিশ্চয়তা না থাকায় তাদের কেউ কেউ ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে খায় উচ্ছিষ্ট খাবার। রাত হলে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে আবার ফুটপাত কিংবা বন্ধ দোকানের সামনে ফিরে আসে তারা।
এক পথশিশু বলছিল, ‘আমরা অনেক সময় দিনরাত না খেয়ে থাকি। খিদের জ্বালায় অনেক কিছু করতে হয়। আমরাও অন্য শিশুদের মতো জীবন গড়ে তুলতে চাই। সরকার যদি থাকার ও পড়াশোনার সুযোগ করে দেয়, তাহলে আমরাও অন্যদের মতো জীবন গড়তে পারব।’
এই কথার মধ্যে ফুটে ওঠে তাদের সবচেয়ে বড় বঞ্চনা। তারা শুধু খাবার বা ঘরের অভাবে নেই, হারাচ্ছে পড়াশোনা, নিরাপত্তা এবং স্বাভাবিক শৈশবের সুযোগও।
শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও রয়েছে এসব শিশুর। নিয়মিত গোসল, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা নেই অনেকের। খোলা জায়গায় রাত কাটানো, মশার কামড়, অনিরাপদ খাবার ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ তাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা। অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগও অনেকের থাকে না।
তবে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সৃষ্টি হয় রাতের অন্ধকারে। অভিভাবকহীন এসব শিশু সহজেই মাদকসেবী ও অপরাধী চক্রের সংস্পর্শে আসতে পারে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কেউ কেউ অল্প বয়সে সিগারেট, ড্যান্ডি, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকে জড়িয়ে পড়ছে। মাদকের টাকা জোগাতে চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। আবার কিছু চক্র শিশুদের দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি কিংবা ছোটখাটো অপরাধ করিয়ে তাদের আয়ের একটি অংশ নিয়ে নেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বললেন, ‘উন্নয়ন কার জন্য? শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে কোনো দেশ এগোতে পারে না। পথশিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে এই উন্নয়ন অর্থবহ হবে না।’
তিনি বললেন, এসব শিশুর জরুরি ভিত্তিতে পুনর্বাসন প্রয়োজন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পুনর্বাসনকেন্দ্র চালুর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। শিশুদের পরিবারে ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি যাদের পরিবারে ফেরার সুযোগ নেই, তাদের জন্য নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করা দরকার।
জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন ‘খেলাঘর’ কক্সবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কবি এম জসিম উদ্দিন বললেন, ‘আজ যারা শিশু, একদিন তারাই সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেবে। অথচ সুবিধাবঞ্চিত শিশুর একটি বড় অংশ এখনো অন্ধকারে রয়ে গেছে।’
তার মতে, এসব শিশুর দিকে শুধু সরকারের তাকিয়ে থাকলে হবে না। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সমাজের বিত্তবান মানুষ এবং সাধারণ নাগরিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে। পর্যাপ্ত পুনর্বাসনকেন্দ্র তৈরির পাশাপাশি শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত প্রত্যেক ব্যক্তিই শিশু। তাই পথশিশুদের নিরাপদ জীবন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, শিশু অধিকার রক্ষারও অংশ।
কক্সবাজারের মতো পর্যটননির্ভর শহরে প্রতিদিন হাজারো মানুষ আসেন। সমুদ্রের ঢেউ দেখতে, সূর্যাস্ত উপভোগ করতে কিংবা শহরের আলোঝলমলে রাত কাটাতে অনেকে অর্থ ব্যয় করেন। অথচ সেই শহরের কোনো ফুটপাতে একই রাতে একটি শিশু হয়তো না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। তার বিছানা হয় কার্টনের টুকরো, মাথার ওপর থাকে খোলা আকাশ।
এই বৈপরীত্য শুধু কক্সবাজারের নয়, সমাজেরও একটি আয়না। পথশিশুকে ফুটপাত থেকে সরিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। তাকে কোথায় নেওয়া হবে, কী খাবে, কোথায় পড়বে, কে তার নিরাপত্তা দেবে, অসুস্থ হলে কে পাশে দাঁড়াবে, সেই প্রশ্নগুলোর উত্তরও দিতে হবে।




