রাতের ভরসা কুপি-হারিকেন, বর্ষায় কলাগাছের ভেলা

কলাগাছের ভেলায় করে বাড়ি যাচ্ছেন ৯৩ বছর বয়সী কাশেম আলী— আগামীর সময়
দেশ এগিয়েছে, বদলেছে সময়। প্রত্যন্ত গ্রামে পৌঁছেছে বিদ্যুতের আলো। অথচ শেরপুরের ঝিনাইগাতীর সারিকালীনগর নামাপাড়ার ৯৩ বছর বয়সী কাশেম আলীর ঘর এখনো অন্ধকারেই ডুবে থাকে। সন্ধ্যা হলেই হারিকেন আর কুপির ম্লান আলোয় শুরু হয় তার রাত। উন্নয়নের দীর্ঘ পথচলায় যেন এই পরিবারটি রয়ে গেছে একেবারেই প্রান্তিক হয়ে।
গারো পাহাড়ের পাদদেশের দুর্গম এ জনপদে চলাচলের রাস্তা, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের মতো মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা। বর্ষা এলেই পানিতে ডুবে যায় বসতভিটা ও চলাচলের পথ। তখন তাদের একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে কলাগাছের ভেলা।
জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে কাশেম আলী বললেন, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় থেকেই এখানে আছি। এত বছর পার হয়ে গেল, কিন্তু নিজের চোখে বিদ্যুতের আলো দেখা হলো না। এখনো হারিকেন আর কুপির আলোতেই জীবন কাটে। বর্ষাকালে ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে থাকে। বাইরে যেতে হলে কলাগাছের ভেলায় উঠতে হয়। শুকনো সময়েও রাস্তা নেই, জমির আইল ধরে চলাচল করতে হয়।’
অভিমানভরা কণ্ঠে এই বৃদ্ধ জানালেন, অনেকেই আসে, ছবি তোলে, কষ্টের কথা শোনে। কিন্তু পরে আর কেউ খবর নেয় না।
ভূমি নেই ভূমি অফিসের
১৯ জুলাই ২০২৬
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাশেম আলীর বাড়িতে বর্তমানে তিনটি পরিবার বসবাস করছে। দীর্ঘদিন ধরে তারা নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বর্ষা মৌসুমে প্রতিবছরই তারা পানিবন্দি হয়ে পড়েন। বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, বিশুদ্ধ পানির স্থায়ী ব্যবস্থা নেই, নেই স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার। এমনকি যাতায়াতের জন্যও কোনো স্থায়ী রাস্তা নেই।
স্থানীয়রা জানান, বর্ষাকালে শিশুদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত ব্যাহত হয়। রাতের বেলায় কুপি ও হারিকেনের আলোয় চলে রান্নাবান্না, পড়াশোনা এবং প্রয়োজনীয় কাজ। অনেক সময় পুরোনো কাপড় দিয়ে তৈরি সলতের কুপিই হয়ে ওঠে তাদের একমাত্র আলোর উৎস। এই পরিবারের দুর্ভোগের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে কাশেম আলীর এক ছেলের মৃত্যুর পর। আশপাশে কোনো কবরস্থান না থাকায় বাধ্য হয়ে তাকে নিজ ঘরের মাটির মেঝেতেই দাফন করতে হয়।
তারুণ্যের ঝিনাইগাতী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান মন্তব্য করেন, ‘দেশ যখন স্মার্ট বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন কোনো পরিবার যদি এখনো মৌলিক সুবিধাবঞ্চিত থাকে, সেটি দুঃখজনক। প্রশাসনের দ্রুত উদ্যোগ প্রয়োজন। আমরাও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।’
এ বিষয়ে ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল-আমিন বলেছেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। দ্রুত সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিদ্যুৎ, রাস্তা, পানি ও স্যানিটেশন সুবিধার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে কথা বলা হবে।’






